দেশজুড়ে

সমন্বয়ক ছাড়াই টিকে ছিল রাজশাহীর আন্দোলন

২০২৪ সালের ২৭ জুলাই। এই দিনের আগে থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে একের পর এক ডিবি হেফাজতে নেওয়া হচ্ছিল। এদিন আন্দোলনের আরও দুই কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়।

Advertisement

এর আগের দিন (২৬ জুলাই) রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। ফলে আন্দোলনের পাঁচ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কই তখন ডিবির হেফাজতে ছিলেন।

সমন্বয়কদেরকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার প্রসঙ্গে তৎকালীন ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে জানার জন্য এবং তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে সমন্বয়কদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২২ জুলাই / মেসগুলোতে চিরুনি অভিযান, আতঙ্কে রাত কাটান শিক্ষার্থীরা

এদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার বিষয়ে আদালতের রায়ের পর সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করে, তা প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ওইদিন রাতেই অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে নতুন তিন দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

Advertisement

‘অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে নতুন তিন দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ’

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের সমন্বয়করা জানান, দেশজুড়ে ধরপাকড়ের কারণে অনেক সমন্বয়কের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে তিন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের খোঁজ নিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ডিবি কার্যালয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শরীরে এভাবেই লিখেছিলেন এক আন্দোলনরত শিক্ষার্থী/ছবি- জাগো নিউজ

Advertisement

একই দিনে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের সংকট উত্তরণে দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

অন্যদিকে, ২৬ জুলাই গভীর রাতে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে রাজধানীর হাতিরঝিলের বাসা থেকে আটক করা হয়।

কেন্দ্রের সংকটের প্রভাব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে:

রাজধানীতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। রাজশাহীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। চলমান কারফিউ আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় এবং আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের খোঁজে নগরীর বিভিন্ন ছাত্রমেস ও শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলে তল্লাশি চালানো হয়। গ্রেফতার ও নজরদারির আশঙ্কায় অনেক শিক্ষার্থী আত্মগোপনে চলে যান। নিরাপত্তার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি।

একই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নেতৃত্বের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। ২৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের সমন্বয়ক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কেন্দ্র অনুমোদিত কোনো সমন্বয়ক কমিটি না থাকায় আন্দোলন পরিচালনার মতো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়। ফলে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের আটকের প্রভাব সরাসরি রাজশাহীর আন্দোলনেও পড়ে।

‘আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের খোঁজে নগরীর বিভিন্ন ছাত্রমেস ও শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলে তল্লাশি চালানো হয়। গ্রেফতার ও নজরদারির আশঙ্কায় অনেক শিক্ষার্থী আত্মগোপনে চলে যান। নিরাপত্তার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেনি’

কারফিউ, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে ২৬ ও ২৭ জুলাই রাজশাহীর আন্দোলনকারীরা বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি মাঠে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তবে আন্দোলন পুরোপুরি থেমে যায়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে মেহেদী সজিব, ফাহিম রেজা, সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বার্তা এবং নিজেদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্দোলনের কার্যক্রম সচল রাখেন।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২১ জুলাই / ইন্টারনেট বন্ধে ভারতীয় নেটওয়ার্কে যোগাযোগ রাজশাহীর সমন্বয়কদের

একই সময়ে কেন্দ্রের অনুমোদনের জন্য একটি নতুন সমন্বয়ক তালিকা পাঠানোর কাজও চলতে থাকে। ২৮ জুলাই কেন্দ্রের অনুমোদনক্রমে ১৭ সদস্যের নতুন সমন্বয়ক কমিটি প্রকাশ করা হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে নতুন গতি ফিরে আসে।

জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক মেহেদী সজিব বলেন, ‘শুরু থেকেই কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আন্দোলন পরিচালনা করতে চেয়েছিলাম। আগে যে দুটি সমন্বয়ক প্যানেল ছিল, তার কোনোটিই কেন্দ্র অনুমোদিত ছিল না। ২৫ জুলাই কয়েকজন প্রতিনিধি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর দ্রুত একটি আনুষ্ঠানিক কমিটির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। কারণ, আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব না থাকলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘২৬ ও ২৭ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সমন্বয়ক ছিল না। তবুও আন্দোলন থেমে থাকেনি। ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও বার্তা এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মসূচি সচল রাখা হয়। একই সঙ্গে পূর্বে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বয়ক তালিকা প্রস্তুত করা হয়।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমান সিনেট সদস্য ফাহিম রেজা বলেন, ‘২৬ ও ২৭ জুলাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। কেন্দ্রের একের পর এক সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার খবর আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। একই সময়ে রাজশাহীতেও কারফিউ আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। শিক্ষার্থীদের মেসে মেসে তল্লাশি, পরিচয় যাচাই এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে অনেকেই নিরাপত্তার শঙ্কায় বাসা কিংবা মেস থেকে বের হতে পারেননি। ফলে প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করা তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।’

জুলাই গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনের সময় রাবিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান/ছবি- জাগো নিউজ

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সংকট ছিল নেতৃত্বের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন কেন্দ্র অনুমোদিত কোনো সমন্বয়ক কমিটি ছিল না। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বার্তা পৌঁছে দেওয়া কিংবা কর্মসূচি সমন্বয়ের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোও ছিল না। তারপরও কেউ মনে করিনি আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে। বরং বিশ্বাস করেছিলাম, আন্দোলনের শক্তি কয়েকজন নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, হাজারো সাধারণ শিক্ষার্থীর ঐক্যই ছিল এর সবচেয়ে বড় ভিত্তি। জুলাই আন্দোলনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই একেকজন সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন।’

ফাহিম আরও বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফোনকল এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে একে অপরের খোঁজখবর রাখতাম। কে কোথায় আছে, কার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, কীভাবে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়- এসব বিষয় নিয়েই প্রতিনিয়ত আলোচনা হতো। মাঠে নামতে না পারলেও আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, গুজব থেকে সতর্ক থাকা এবং শিক্ষার্থীদের মনোবল অটুট রাখার চেষ্টা করেছি।’

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২৫ জুলাই / ঢাকায় আন্দোলন চলমান, রাবিতে প্রত্যাহার

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসুর সাবেক জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘কেন্দ্রীয় তিন সমন্বয়ককে আটকের পর রাজশাহীতে কারফিউ আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। বাইরে বের হওয়াই তখন কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়েও কেন্দ্র অনুমোদিত কোনো সমন্বয়ক কমিটি ছিল না। ফলে অনলাইন প্রচারণা, ভিডিও বার্তা এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমেই আন্দোলন সচল রাখতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‌‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সমন্বয়ক প্যানেল থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই কেন্দ্র অনুমোদিত ছিল না। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে নিতে হয়েছে। তবে ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কমিটি না থাকলেও আন্দোলন এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি। নানা কৌশল, পারস্পরিক সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের দৃঢ় মনোবলের কারণেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্র অনুমোদিত কমিটি গঠনের মাধ্যমে আন্দোলন আরও সুসংগঠিত রূপ পায়।’

এসজেডএইচ/এএসএম