হাতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের ঝকঝকে সনদ, অথচ চাকরির বাজারে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ নেই। সীমিত কর্মসংস্থানে তীব্র প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন তরুণরা, বাড়ছে বেকারত্ব ও হতাশা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণই কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে কার্যকর সমাধান হতে পারে। এমন কর্মমুখী শিক্ষায় জীবন বদলাচ্ছেও অনেকের।
Advertisement
খাগড়াছড়ির এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান আমানত শাহ। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। ছয় সদস্যের পরিবারের বড় স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সবসময় সহজ ছিল না। এইচএসসি শেষ করার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন- শুধু সার্টিফিকেট নয়, জীবনে এগিয়ে যেতে প্রয়োজন বাস্তবমুখী দক্ষতা।
আরও পড়ুন দক্ষতার ঘাটতিতে দেশে উচ্চশিক্ষিত ৯ লাখ যুবক বেকারনিজের এলাকায় বা বাইরে কম্পিউটার অপারেশন কোর্স করতে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষেই বহন করা কঠিন। ঠিক তখনই আমানত শাহ জানতে পারেন ‘ইউসেপ মিরপুর টিভেট ইনস্টিটিউটের’ কথা। দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন এই কারিগরি প্রতিষ্ঠানে তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছয় মাসের কম্পিউটার অপারেশন কোর্সে ভর্তি হন। পাঁচ মাস তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এক মাসের ইন্টার্নশিপ তাকে প্রস্তুত করেছে বাস্তব কর্মজীবনের জন্য।
সুবিধাবঞ্চিত ৪ লাখ ৩ হাজার ৯৫৭ জনকেও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করেছে ইউসেপ বাংলাদেশ/ছবি: জাগো নিউজ
Advertisement
আমানত বলেন, ‘এখানকার সুন্দর ক্যাম্পাস, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ উপকরণ এবং সবচেয়ে বড় কথা শিক্ষকদের আন্তরিকতা আমাকে প্রতিদিন নতুন করে শেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ইউসেপে শুধু কম্পিউটার নয়, কেয়ারগিভিং, অটোমোবাইলসহ মোট ২২টি ট্রেডে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।’
আরও পড়ুন উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ৬২ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরপাবনার মেয়ে আফসানা খানমের গল্পটাও প্রায় একই রকম। সরকারি বাঙলা কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর তারও স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরি। কিন্তু বাস্তবতা তাকে ভিন্ন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আফসানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু সাধারণ বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেই আজকাল চাকরি পাওয়া সহজ নয়। প্রায় প্রতিটি নিয়োগেই দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্বামীর এক বন্ধুর মাধ্যমে ইউসেপ সম্পর্কে জানতে পেরে ক্যাম্পাস পরিদর্শনের পর আমি কেয়ারগিভিং ট্রেডে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’ এখানকার শিক্ষকদের আন্তরিকতা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পদ্ধতি এবং কর্মমুখী পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করেছে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন ১ বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার / দেশে বেকার এখন ২৬ লাখ ৬০ হাজারতরুণদের উদ্দেশে আফসানার আন্তরিক আহ্বান- ‘অকারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা আড্ডায় সময় নষ্ট করবেন না। একবার ইউসেপ বাংলাদেশে এসে দেখুন। একটি দক্ষতা অর্জন করুন। কারণ একটি দক্ষতাই আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।’
Advertisement
ক্ষেত্রবিশেষে বিনামূল্যে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলছে ইউসেপ/ছবি: জাগো নিউজ
আমানত শাহ বা আফসানার মতো এই তরুণ-তরুণীদের গল্প কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের আলোর পথ দেখাতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ইউসেপ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে নিউজিল্যান্ডের নাগরিক লিন্ডসে অ্যালান চেইনির হাত ধরে বাংলাদেশে যাত্রা করে সংস্থাটি। সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও যুবসমাজকে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) প্রদানের মাধ্যমে দেশীয় তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইউসেপ।
আরও পড়ুন উচ্চ বেকারত্বের মধ্যেও সরকারি চাকরিতে প্রায় ৫ লাখ পদ শূন্যইউসেপের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইউসেপের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে তরুণ সমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর না করলে কেবল সনদের জোরে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। আমরা স্বল্প ও মানসম্মত খরচে বা ক্ষেত্রবিশেষে বিনামূল্যে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলছি। তরুণদের এই কর্মমুখী শিক্ষায় আরও বেশি আগ্রহী হতে হবে।’
ইউসেপ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৫ হাজার ২৬ জনকে বিভিন্ন ট্রেডে পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে/ছবি: জাগো নিউজ
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউসেপ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২ লাখ ৮৫ হাজার ২৬ জনকে বিভিন্ন ট্রেডে পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এর মধ্যে সফলভাবে কর্মসংস্থান বা চাকরি পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৯৯ জন। শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণই নয়, এর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ৪ লাখ ৩ হাজার ৯৫৭ জনকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাও প্রদান করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আরও পড়ুন যুবাদের দক্ষতা উন্নয়নে ইউসেপ বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার বেকার, যার আনুপাতিক হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টরা কর্মমুখী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা নেই- তরুণ প্রজন্মের এই শূন্যতা পূরণে এবং বেকারত্ব দূরীকরণে ইউসেপ বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার নাম। তাদের হাত ধরে চাকরির দুয়ার খুলছে লাখো তরুণ-তরুণীর।
এসইউজে/ইএ