শিল্প উৎপাদনের মৌলিক অনুষঙ্গ হলো জ্বালানি। শিল্প খাতের বিকাশ এর প্রাপ্যতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ছোট বড় সকল কারখানা পরিচালনার জন্য অব্যাহতভাবে জ্বালানি পাওয়া যাবে কিনা সেটি উদ্যোক্তাদের কাছে বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। কারণ জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হলে বিনিয়োগের ওপর প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া, বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো ব্যবসায়িক ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প সুদে ঋণ, করছাড়, নীতিসহায়তা, নগদ প্রণোদনার মতো নানামুখী উদ্যোগও শিল্পে প্রত্যাশামাফিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে না। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দেশের শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি।
Advertisement
বিগত বছরগুলোয় দেশে শিল্প প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এর কারণ হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সীমিত ও বিনিয়োগ স্থবিরতাকে প্রধানতম দায়ী করা হয়। এটা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে কাঙ্ক্ষিত ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ না আসার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি সংকট। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র প্রায় ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি নিয়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসন খাত পরিচালিত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নেই। কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে, কোথাও কারখানা আংশিক চালু, কোনো কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংকট বন্ধ হয়ে যাওয়া সার কারখানাগুলোই এর বড় দৃষ্টান্ত। আবার জ্বালানি অপ্রতুলতায় নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগও কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
সরকার শিল্পের বিকাশে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও সম্প্রসারণে প্রয়োজন চাহিদামাফিক জ্বালানি সরবরাহ করা। এজন্য প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কীভাবে নিজস্ব কূপ থেকে কয়লা উত্তোলন করা যায় এবং এটাকে যতটা সম্ভব পরিবেশবান্ধব রাখা যায় তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
Advertisement
ক্রমেই জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে রয়েছে স্থানীয় উৎস থেকে জ্বালানি পণ্য অনুসন্ধান ও উত্তোলনকে অগ্রাধিকার না দেয়া। বিপরীতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানিনির্ভর কাঠামো গড়ে তোলা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-২৫ সাল নাগাদ দীর্ঘ আট বছরে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি ও কয়লা আমদানি করা হচ্ছে। এসব জ্বালানি পণ্য আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেবল দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হয়, তা মোট গ্যাসের চাহিদার এখন ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ। এ গ্যাস আমদানি করতে সরকারকে গত অর্থবছরে ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। আর এ খাতে ভর্তুকি লেগেছে অর্থবছরে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আবার গ্যাসের বড় অংশ যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। যদিও পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে রেশনিং করে চালানো হচ্ছে। অথচ দেশে অন্তত সাত হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।
প্রতি বছর এসব কেন্দ্রের জন্য অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকার কয়লাও আমদানি করা হচ্ছে। অথচ দেশে পাঁচটি খনিতে যে পরিমাণ কয়লা রয়েছে তার ২০ শতাংশ উত্তোলন করা গেলেও ১ হাজার ৫৬৪ মিলিয়ন কয়লা উত্তোলন করা যেতে পারে, যা ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা পূরণ হতে পারে বলে জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে। এসব তথ্য এটিই স্পষ্ট করে যে দেশীয় জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোয় জোর না দিয়ে কীভাবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে এবং অর্থনীতিতে ঝুঁকি বেড়েছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটে, দাম বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় জ্বালানির বাজার দোদুল্যমান থাকে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। এর আগে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও জ্বালানি ঘিরে বড় সংকট তৈরি হয়। একদিকে সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে বাড়তি দাম শিল্প থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব খাতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বিশেষ করে জ্বালানি দামের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে তা নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণকেও নিরুৎসাহিত করে।
দেশের অতীত উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে ছিল সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্পমূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি দেয়া গেছে। এতে স্বল্পমূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকট ও এর উচ্চমূল্য শিল্প উৎপাদন ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ উভয়মুখী সংকট কাটিয়ে ওঠা দরকার।
Advertisement
সরকার শিল্পের বিকাশে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও সম্প্রসারণে প্রয়োজন চাহিদামাফিক জ্বালানি সরবরাহ করা। এজন্য প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কীভাবে নিজস্ব কূপ থেকে কয়লা উত্তোলন করা যায় এবং এটাকে যতটা সম্ভব পরিবেশবান্ধব রাখা যায় তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে জরুরি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো। কারণ আগামীতে জ্বালানির চাহিদা আরো বাড়বে, যা সীমিত জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদ নিয়ে মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/এএসএম