ফিচার

বিদেশে প্রতারণার শিকার, দেশে ফিরে পুরোনো বাইকের ব্যবসায় সফল মেহেদী

রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরে পুরোনো মোটরসাইকেলের হাটে সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড়। সারি সারি মোটরসাইকেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক তরুণ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ বাইকের ইঞ্জিন দেখছেন, কেউ কাগজপত্র যাচাই করছেন, আবার কেউ দরকষাকষি করছেন। ব্যস্ত সেই তরুণের নাম মেহেদী হাসান।

Advertisement

কয়েক বছর আগেও তিনি ছিলেন প্রবাসী। জীবনের বড় স্বপ্ন ছিল বিদেশে সফল ব্যবসায়ী হওয়ার। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে সবকিছু হারানোর পর দেশে ফিরে আসেন। আজ দেশেই পুরোনো মোটরসাইকেলের ব্যবসা করে নিজের নতুন পরিচয় তৈরি করেছেন এই তরুণ।

হাটে ঘুরাঘুরির ফাঁকে কথা হয় এই তরুণের সঙ্গে, জানা যায়, মিরপুর-১৪ নম্বরের স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান। ২০২০ সালে জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যান। সেখানে শেয়ারের মাধ্যমে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা ভালোই এগোচ্ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল অনেক পরিকল্পনা। কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। তার ব্যবসায়িক অংশীদার বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পুঁজি হারিয়ে ফেলেন এই তরুণ।

পুরোনো মোটরসাইকেল বিক্রি করে মেহেদী মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করেন

Advertisement

এই ধাক্কা শুধু অর্থনৈতিক ছিল না, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন মেহেদী। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নতুন করে শুরু করার মতো অবস্থাও তখন ছিল না। অনেক চিন্তাভাবনার পর ২০২৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

তবে দেশে ফেরার আগে তিনি একটি কাজ করে রেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিদেশে থাকাকালীন দেশে একটি ছোট্ট পুরোনো মোটরসাইকেলের শোরুম খুলেছিলেন। ব্যবসাটি পরিচালনা করতেন তার মামা। তখন এটি ছিল ছোট একটি উদ্যোগ। বিদেশের ব্যবসা ভালো চলায় শোরুমটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিদেশের ব্যবসা ভেঙে পড়ার পর সেই ছোট উদ্যোগই হয়ে ওঠে নতুন জীবনের ভিত্তি।

আরও পড়ুন বিদেশে পড়তে গেলে যে কারণে আমাদের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়

দেশে ফিরে মেহেদী কোনো চাকরির পেছনে ছোটেননি। আবার বিদেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি। বরং নিজের হাতে যা মূলধন ছিল, তার সবটুকু পুরোনো মোটরসাইকেলের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। শোরুমে নিয়মিত সময় দেওয়া শুরু করেন। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মোটরসাইকেল খোঁজা, দাম যাচাই, কাগজপত্র পরীক্ষা করা, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ-সবকিছুই নিজ হাতে করতে থাকেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পুরোপুরি এই ব্যবসায় মনোযোগ দেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে তার ব্যবসা গতি পেতে শুরু করে। বর্তমানে প্রতিটি পুরোনো বাইক বিক্রি করে গড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লাভ করেন। মাস শেষে তার আয় দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।

Advertisement

হাটে এসে পুরোনো বাইক কিনে হাটেই বিক্রি করেন তিনি

বর্তমানে পুরোনো মোটরসাইকেলের ব্যবসার মধ্যেই কেমন কাটছে তার দিন, আর বিদেশের সেই ক্ষতি তিনি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন কি না-এসব বিষয় নিয়েই হাটে ক্রেতাদের ব্যস্ততার ফাঁকে মেহেদীর সঙ্গে কথা হয়।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২০ সালে বিদেশে গিয়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ, ব্যবসাও বেশ ভালো চলছিল। এরই মধ্যে সুযোগ পেলেই দেশে আসতাম। সেই সময় দেশে পুরোনো মোটরসাইকেল বিক্রির একটি ছোট শোরুম চালু করি। শোরুমটির দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন আমার মামা। কিন্তু হঠাৎ করেই বিদেশে সেই অংশীদার ব্যবসার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। এতে আমি বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ি।’

মেহেদী আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে ২০২৪ সালে দেশে ফিরে আসি। এত বড় ক্ষতির পরও ভেঙে পড়িনি। বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পুরোনো মোটরসাইকেল বিক্রির শোরুমটিতেই পুরোপুরি মনোযোগ দিই।

আরও পড়ুন বনেদি বংশের সংস্কৃতি-শিষ্টাচার, আসবাবপত্রের আভিজাত্য বাংলার ঐতিহ্যবাহক

মিরপুর-১৩ নম্বরে প্রতি শুক্রবার পুরোনো বাইকের হাট বসে। এখানে এসে পুরোনো বাইক কিনি এবং হাটেই বিক্রি করার চেষ্টা করি। এছাড়া সপ্তাহের বাকি দিনগুলো শোরুমে বাইক বিক্রি করি। বর্তমানে ব্যবসা বেশ ভালো চলছে। যদিও বিদেশে হওয়া ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তবুও এই ব্যবসার আয়েই পরিবার নিয়ে ভালোভাবেই জীবনযাপন করছি।’

মেহেদী হাসানের জীবন যেন একটি বাস্তব শিক্ষা। বিদেশে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়েও তিনি হারাননি নিজের সাহস। বরং সেই ব্যর্থতাকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। আজ তিনি শুধু একজন সফল মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী নন, বরং এমন একজন তরুণ, যার গল্প প্রমাণ করে জীবনে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় হার থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে বড় জয়ের গল্প।

কেএসকে