প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরের পোশাক শিল্পে বাংলাদেশিদের পথচলার ইতিহাস আজ তিন দশকেরও বেশি সময়ের। কিন্তু এই ইতিহাসের সূচনা সাফল্যের আলোকোজ্জ্বল অধ্যায় দিয়ে নয়; বরং প্রতারণা, স্বপ্নভঙ্গ, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
Advertisement
সেই দুঃসহ বাস্তবতাকে জয় করেই আজ তাদের অনেকেই হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা, দক্ষ ব্যবস্থাপক এবং অসংখ্য বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের নির্ভরতার নাম।
১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ৭৫ জন বাংলাদেশিকে মিশরের ইজি-ফ্রান্স নামের একটি পোশাক কারখানায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কয়েক দিনের মধ্যেই কারখানাটির লেবানিজ মালিক কাউকে কিছু না জানিয়ে পালিয়ে যান। মুহূর্তেই থেমে যায় কারখানার কার্যক্রম। শ্রমিকরা কার্যত কারখানার ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দিনের পর দিন অনাহার-অর্ধাহারে, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবন।
আরও পড়ুন কোম্পানি ঘুরছে কর্মীর পেছনে!অবশেষে সুযোগ বুঝে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর ডলফিনসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানায় নতুন করে শুরু হয় তাদের জীবনসংগ্রাম। সেই প্রথম ৭৫ জন বাংলাদেশিই আজ মিশরের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে পরিচিত ‘৭৫ গ্রুপ’ নামে।
Advertisement
সময়ের প্রবাহে তাদের অনেকেই আজ আর পৃথিবীতে নেই। তবে যারা এখনো আছেন, তাদের কেউ মিশরের বিভিন্ন শহরের পোশাক কারখানায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কেউ সততা, দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তাদের হাত ধরেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশির জন্য।
তাদের জীবনগাঁথা শুধু জীবিকা অর্জনের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিচল লড়াই, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সুনাম প্রতিষ্ঠার এক গৌরবগাঁথা।
সম্প্রতি সুয়েজ খালের তীরবর্তী ইসমাইলিয়া শহরে দেখা হয় ‘৭৫ গ্রুপ’-এর কয়েকজন সদস্য এবং আরও অনেক বাংলাদেশি প্রবাসীর সঙ্গে। দীর্ঘদিন পর দেশের একজন সাংবাদিককে কাছে পেয়ে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা না-বলা স্মৃতি, বেদনা ও সাফল্যের গল্প একে একে উন্মোচিত করেন তারা।
আলোচনায় জানা যায়, বর্তমানে ইসমাইলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় দুই শতাধিক বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কঠোর পরিশ্রমের উপার্জনে কেউ সন্তানদের ইউরোপের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন। সংগ্রাম থেকে সাফল্যের এই অভিযাত্রা আজ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
Advertisement
ইয়াসমিনা গার্মেন্টসের কোয়ালিটি ম্যানেজার ইব্রাহিম হাসান বলেন, মিশরের পোশাক শিল্পে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশিই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেকেই পর্যাপ্ত শিক্ষিত না হওয়ায় দূতাবাসের অনলাইন ফরম নিজেরা পূরণ করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অন্যের সহায়তা নিতে হয় এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। তার মতে, বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি হেল্প ডেস্ক চালু করা হলে হাজারো শ্রমিক সহজেই প্রয়োজনীয় সেবা পেতেন।
তিনি আরও বলেন, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেখে আসছেন, ১৯৯৪ সালে আগত ‘৭৫ গ্রুপ’-এর সদস্যদের বাংলাদেশ দূতাবাস বিশেষ সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করত। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চর্চা আর চোখে পড়ছে না।
ইব্রাহিম হাসানের ভাষায়, ‘এই ‘৭৫ গ্রুপ’-এর অনেকেই আজ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, এমনকি কারখানার মালিকও হয়েছেন। অথচ তাদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন এখন আর তেমনভাবে হয় না।
‘৭৫ গ্রুপ’-এর সদস্য এন. ইসলামও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এক সময় দূতাবাসের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। কিন্তু গত তিন বছরে একটি অনুষ্ঠানেও ডাক পাইনি। তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের অভিমান। তিনি বলেন, আমাদের কোনো বিশেষ সুবিধা দরকার নেই। শুধু চাই, দূতাবাসে গেলে আমাদের মানুষ হিসেবে সম্মান করা হোক।
পোর্ট সাঈদের প্লাজা রেডিমেড গার্মেন্টসের কারখানা ব্যবস্থাপক ফারুক সরকার জানান, ইসমাইলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতি মাসে ছুটির আগের কোনো এক সন্ধ্যায় তারা কোনো না কোনো বাংলাদেশির বাসায় একত্রিত হন। সেখানে দেশীয় খাবারের আয়োজনের পাশাপাশি চলে গল্প, হাসি-আনন্দ, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি এবং মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও। তার ভাষায়, প্রবাসে আমরা একে অপরের পরিবারের মতো। সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করি।
তিনি আরও বলেন, ইসমাইলিয়ায় বাংলাদেশিদের সার্বিক অবস্থান তুলনামূলক ভালো। অধিকাংশ শ্রমিক বৈধভাবে কর্মরত এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা করে দেয়। ইপিজেড এলাকার শ্রমিকরা তুলনামূলক বেশি সুযোগ-সুবিধা পেলেও অন্যান্য কারখানার অবস্থাও সন্তোষজনক।
তার মতে, মিশরের পোশাক শিল্পে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। থাকা-খাওয়ার সুবিধার পাশাপাশি একজন দক্ষ অপারেটর মাসে প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার, সুপারভাইজার ৫০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলার এবং ফ্লোর ইনচার্জ ১,০০০ থেকে ১,৩০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় করেন।
তবে এই আশাব্যঞ্জক চিত্রের আড়ালেও রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সংকট। ফারুক সরকার বলেন, ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন ওয়ার্ক ভিসা কার্যত বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলে মিশরে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন করে ওয়ার্ক পারমিট চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সংগ্রাম, সাফল্য এবং আত্মত্যাগ—এই তিন শব্দেই যেন সংক্ষেপে ধরা পড়ে মিশরের ‘৭৫ গ্রুপ’ বাংলাদেশিদের ইতিহাস। যারা একদিন অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটিয়েছিলেন, তারাই আজ নিজেদের শ্রম, সততা ও দক্ষতায় বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সুনাম উজ্জ্বল করছেন। তাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশি পরিবার, সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে রেমিট্যান্স।
তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধাও নয়। তারা শুধু চান- রাষ্ট্র যেন তাদের এই পথিকৃৎ অবদানকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ রাখে, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায় এবং মিশরের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের এই সংগ্রামী মানুষদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দেয়।
কারণ, ইতিহাসের পাতায় হয়তো তাদের নাম বড় অক্ষরে লেখা নেই; কিন্তু মিশরের পোশাক শিল্পে বাংলাদেশিদের যে শক্ত ভিত্তি আজ প্রতিষ্ঠিত, তার প্রথম ইটটি বসিয়েছিলেন এই ‘৭৫ গ্রুপ’-এর সেই সাহসী মানুষগুলোই। তাদের সংগ্রামই আজকের সাফল্যের ভিত, আর তাদের আত্মত্যাগই আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা।
এমআরএম