এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে এবার উৎসে কর বা ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স (টিডিএস) আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি।
Advertisement
নতুন অর্থবছরে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। যার মধ্যে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে বিদ্যমান আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন পরিদর্শন, হিসাবপত্র যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি ও ডিজিটাল তথ্য জব্দের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এনবিআর।
তবে সংস্থাটির এ ধরনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপে কর ফাঁকি রোধের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় (অটোমেশন) না করে কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দিলে সুশাসনের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এরই মধ্যে বিজিএমইএ, ঢাকা চেম্বার-সহ একধিক বাণিজ্য সংগঠন এ উদ্যোগ বন্ধের জন্য এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে।
Advertisement
গত ১৯ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, উৎসে কর যথাযথভাবে কর্তন ও জমা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে কর্মকর্তারা যে কোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন।
এনবিআরের অধিকাংশ কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ। দায়িত্ব নিয়েই বলছি। এ উদ্যোগ ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে এর অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।—ফজলে শামীম এহসান
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদসহ আর্থিক কার্যক্রম-সংক্রান্ত যে কোনো নথি পরীক্ষা ও তলব করতে পারবেন। একই সঙ্গে কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্যও যাচাই করতে পারবেন। প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্য সংগ্রহের সুযোগও থাকবে।
আরও পড়ুন এবারের বাজেটে রাজস্বে বড় বাজি, ঘাটতিও বড়শুধু তা-ই নয়, উৎসে কর কর্তনের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে রাখার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথি, ছবি কিংবা অ্যাকাউন্টের অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারবেন কর্মকর্তারা।
Advertisement
এ ধরনের পরিদর্শনে কেউ বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই ধারায় বাধা, অসহযোগিতা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ জাগো নিউজকে বলেন, ধারা ১৪৭ সংক্রান্ত যে কোনো হয়রানি, অস্পষ্টতা কিংবা সংক্ষুব্ধতায় সরাসরি এনবিআরের ১৪৭ ধারা সংক্রান্ত কমিটির সদস্যসচিব বরাবর ই-মেইল বা জানানোর সুযোগ রয়েছে।
‘এ উদ্যোগ ভালো কিছু বয়ে আনবে না’এনবিআরের এ ঘোষণাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন ভয়ভীতি দেখিয়েই কর আদায় বাড়ানো যায়। ভালো কর্মকর্তা যেমন আছেন, তেমনই মাঠপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে হয়রানিও করেন।—হেলাল উদ্দিন
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনবিআরের অধিকাংশ কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ। দায়িত্ব নিয়েই বলছি। এ উদ্যোগ ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে এর অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।’
‘টিডিএস বা উৎসে কর তো ব্যবসায়ীদের কর নয়। আমরা শুধু সরকারের হয়ে কর সংগ্রহ করে জমা দিই। সেই কর আদায়ের নামে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সুশাসনের পরিপন্থি।’
আরও পড়ুন অ্যামচ্যাম সভায় বক্তারা / দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষীকোনো কর্মকর্তা অনিয়ম করলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে জানাতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এসব বিষয় গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই জবাবদিহি বাড়বে।’
‘পাগলের হাতে খুন্তি দেওয়ার মতো’বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘টিডিএস বিষয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—দুপক্ষেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, প্রশিক্ষণও নেই। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া পাগলের হাতে খুন্তি দেওয়ার মতো।’
তার ভাষ্য, ‘এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন ভয়ভীতি দেখিয়েই কর আদায় বাড়ানো যায়। ভালো কর্মকর্তা যেমন আছেন, তেমনই মাঠপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে হয়রানিও করেন। কর ফাঁকি ধরার আরও অনেক আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে। দোকানে গিয়ে কম্পিউটার বা নথি জব্দ করা কিংবা স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করা উচিত হবে না। এতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হবে, সরকারের জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
শেষ তিন অর্থবছরের চিত্রবিগত কয়েকটি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও আহরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ওই অর্থবছরে মোট আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কোনো কথা বলা হয়নি। আইনে এ ধরনের ক্ষমতা আগে থেকেই রয়েছে। সেটিই আবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।—এনবিআর কর্মকর্তারা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আদায় হয় ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫৬২ কোটি। এর আগের অর্থবছরগুলোতেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি সংস্থাটি।
যা বলছেন ব্যবসায়ী নেতারাব্যবসায়ী নেতাদের মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ছাড়া রাজস্ব আহরণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য আসবে না। তাদের ভাষ্য, করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা গেলে কর ফাঁকি যেমন কমবে, তেমনই কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগও কমবে। এতে ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগও অনেকাংশে সীমিত হয়ে আসবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্য ভালো। তবে কর্মকর্তারা যদি কম্পিউটার বা হিসাবের খাতা জব্দ করতে শুরু করেন, তাহলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হবে। এতে ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে, রাজস্বও বাড়বে না।
আরও পড়ুন উৎসে কর কর্তন তদারকিতে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযানএনবিআরের ঘোষণার পরদিন এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি জানায়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কর পরিপালনে অনুগত (কমপ্লায়েন্ট) ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি কর-অনুগত হতে পারেনি, তাদের প্রয়োজনীয় সময় ও সহযোগিতা দিয়ে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা উদ্দেশ্য নয়’অবশ্য এনবিআর কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কোনো কথা বলা হয়নি। আইনে এ ধরনের ক্ষমতা আগে থেকেই রয়েছে। সেটিই আবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গেলে কর্মকর্তারা অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন। সে কারণেই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অনেক বড়। আয়করের সবচেয়ে বড় অংশ আসে উৎসে কর বা ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স (টিডিএস) থেকে। এ খাতে যেন কোনো ফাঁকি না হয়, সে জন্যই তদারকি জোরদার করা হচ্ছে।’
এসএম/এমকেআর