খেলাধুলা

মেসি, কেপ ভার্দে নাকি ট্রাম্প- ২০২৬ বিশ্বকাপকে কীভাবে মনে রাখবেন?

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর যত সময় গড়িয়েছে, ততই অসংখ্য ম্যাচ, গোল, নাটকীয় মুহূর্ত কিংবা আলোচিত ঘটনাগুলো স্মৃতির আড়ালে চলে যেতে থাকলো। ১৬, ২০ কিংবা ২৪ বছর আগের বিশ্বকাপের সবকিছু কি আর মনে থাকে? খুব কমই।

Advertisement

আজ থেকে ২০ বছর পর কেউ কি মনে রাখবে, ২০২৬ বিশ্বকাপে তুরস্ক একটি ম্যাচে অসংখ্য শট নিয়েও মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই বিদায় নিয়েছিল? কিংবা ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের অপ্রত্যাশিত ড্র, সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের বাজে প্রথমার্ধ, নকআউটে হ্যারি কেইনের জোড়া গোল, কিংবা মরক্কোর বিপক্ষে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত গোল- এসব কি তখনও আলোচনায় থাকবে?

ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত একটি কিংবা স্বল্প সংখ্যক নির্দিষ্ট ঘটনার জন্যই সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যর্থ, তবু সর্বকালের সেরা মেসিই

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ মানেই লিওনেল মেসির বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়। ২০১৮ মানেই কিলিয়ান এমবাপের বিশ্বমঞ্চে সুপারস্টার হয়ে ওঠা। ২০১৪ বলতেই মনে পড়ে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক বিপর্যয়। ২০১০ বিশ্বকাপ মনে করিয়ে দেয় আলোচিত ‘জাবুলানি’ বলকে, আর ২০০৬ বিশ্বকাপের প্রতীক হয়ে আছে জিনেদিন জিদানের সেই হেডবাট।

Advertisement

তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপ কী কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে?

স্পেনের শিরোপা জয়, প্রত্যাশার চেয়ে অনেক শান্ত, কারো কারো কাছে অনেক ম্যাড়ম্যাড়ে একটি ফাইনাল, বড় তারকাহীন কিন্তু দুর্দান্ত ভারসাম্যপূর্ণ এক চ্যাম্পিয়ন দল এবং মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক- সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট ছবি বা ঘটনার সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপকে আটকে রাখা কঠিন। তবে সময়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বিষয়ই এই আসরের পরিচয় হয়ে উঠবে।

২০২৬ বিশ্বকাপকে ২০ বছর পরও মনে রাখার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে ইএসপিএন। সেখান থেকেই সংকলন করা হলো-

৯. আমেরিকায় ফুটবলের প্রকৃত উত্থানের বিশ্বকাপ

২০২৬ বিশ্বকাপ দর্শক উপস্থিতি এবং টিভি দর্শকের দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়েছে। অবশ্য ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ৬৪ থেকে ১০৪ হওয়ার কারণেও এই সংখ্যা বেড়েছে। তবে অতিরিক্ত ম্যাচ না থাকলেও অনেক রেকর্ড ভাঙত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

Advertisement

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম বিশ্বকাপ যেন সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। রেস্তোরাঁ, কফিশপ কিংবা অফিস- সব জায়গাতেই সবার আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বিশ্বকাপ।

কেউ আলোচনা করছিল স্কটল্যান্ড সমর্থকদের নিয়ে, যারা বোস্টনের বারগুলো প্রায় খালি করে ফেলেছিল। কেউ আবার নরওয়ের সমর্থকদের গ্যালারিতে ঐতিহাসিক ভাইকিং নৌকা নিয়ে আসার গল্প করছিল।

দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছিল, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর হয়তো কোনো একদিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো একক মুহূর্ত কখনও আসেনি।

বরং ফুটবল ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ১০ শতাংশ আমেরিকান ফুটবলকে নিজেদের প্রিয় খেলা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আমেরিকান ফুটবল ও বাস্কেটবলের পর এটিই এখন তৃতীয় জনপ্রিয় খেলা, এমনকি বেসবলকেও পেছনে ফেলেছে। অর্থাৎ ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো ফুটবলকে জনপ্রিয় করেনি, বরং প্রমাণ করেছে- ফুটবল ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

আরও পড়ুন মেসির জার্সি থেকে শাকিরার পোশাক- নিলামে উঠছে বিশ্বকাপের যেসব স্মৃতি ৮. যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক

বিশ্বকাপের ইতিহাসে রাজনীতির প্রভাব নতুন নয়। ১৯৩৪ সালে ইতালি কিংবা ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ এখনো অনেকের কাছে রাজনৈতিক প্রভাবের উদাহরণ হিসেবেই আলোচিত।

২০২৬ বিশ্বকাপেও একই ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই বিতর্ক ১৯৩৪ বা ১৯৭৮ সালের মত নয়। কারণ, ইতালি কিংবা আর্জেন্টিনার মত যুক্তরাষ্ট্র এবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়নি।

তবে বসনিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফার কাছে তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলে। যা ফিফা এবং স্বয়ং ট্রাম্প স্বীকার করেন।

পরে ফিফা সত্যি সত্যিই সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। যদিও সেটি ট্রাম্পের চাপে হয়েছিল কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে, ফিফার ওপর ট্রাম্পের নগ্ন হস্তক্ষেপ বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়।

যদিও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় রাউন্ডেই বেলজিয়ামের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। এমনকি গোল উদযাপনের সময় বেলজিয়ামের ফুটবলাররা ট্রাম্পকে ব্যঙ্গও করেন।

আরও পড়ুন গোল ও অ্যাসিস্ট নেই- রদ্রি ছাড়া আর কে জেতেন বিশ্বকাপ এমন গোল্ডেন বল?

যদি যুক্তরাষ্ট্র সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনাল পর্যন্ত যেত, অথবা বালোগুন সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করতেন, তাহলে হয়তো এই ঘটনাই ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হয়ে থাকত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি কেবল একটি অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।

৭. কেপ ভার্দের রূপকথা

৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুর দিকে অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে এটি যে সফল হয়েছে, তা নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে। খেলার মান নিয়েও শুরুতে প্রশ্ন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অনেক নতুন দলগুলোই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল কেপ ভার্দে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশটি এই প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়।

স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে ড্র করে তারা। পরে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও দারুণ লড়াই করে এবং ম্যাচটিকে প্রায় টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়। অথচ স্পেন ও আর্জেন্টিনাই ছিল টুর্নামেন্টের দুই ফাইনালিস্ট।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে সেরা একাদশে মেসি, রদ্রি, ভোজিনহা, এমবাপে; নেই ব্রাজিলের কেউ

আরও বড় আলোচনার জন্ম দেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। তার অসাধারণ গোলকিপিংয়ের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবন এবং বিশেষ করে তার মাকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ভিডিও ভাইরাল হয়। তবু ইতিহাসের বিচারে কেপ ভার্দে হয়তো কিছুটা আড়ালেই থেকে যাবে।

কারণ ৪৮ দলের এই বিশাল আসরে ম্যাচ ছিল অনেক বেশি, গল্পও ছিল অনেক বেশি। ফলে একটি ছোট দেশের অসাধারণ যাত্রা হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য বড় ঘটনাগুলোর ভিড়ে হারিয়ে যাবে।

যদি কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে মিশরকেও বিদায় করত, তাহলে হয়তো ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখতে হতো। কিন্তু তারা সেই পথ পাড়ি দিতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর গল্প হয়েও কেপ ভার্দে হয়তো ২০২৬ আসরের একমাত্র প্রতীক হয়ে উঠতে পারবে না।

৬. যে বিশ্বকাপে ভিএআর ও রেফারিং নিয়ে বিতর্ক চরমে পৌঁছেছিল

যারা সাধারণত ফুটবল দেখেন না, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখেছেন- তাদের অনেকেই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাকে অপছন্দ করেছেন। আবার যারা সারা বছর নিয়মিত ফুটবল অনুসরণ করেন, তাদের বড় অংশও ভিএআরের সমালোচনায় সরব।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ, গোলের মতো ফুটবলের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর আনন্দই যেন ভিএআর কেড়ে নেয়। গোল হওয়ার পরপরই উল্লাসে মেতে ওঠা সমর্থকদের কয়েক সেকেন্ড পর থেমে যেতে হয়- অপেক্ষা করতে হয় ভিএআরের সিদ্ধান্তের জন্য।

আরও পড়ুন যে সব কারণে ২০৩০ বিশ্বকাপও জিততে পারে স্পেন

 বিশেষ করে, রাউন্ড অব-১৬’র ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিশরের করা গোলকে ভিএআরের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বাতিল করা হয়। যেটা সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঠিক একই কারণে আর্জেন্টিনার গোল বাতিল না করাটাও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে প্রকৃত ফুটবলপ্রেমীদের কাছে।

শুধু তাই নয়, কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের এমবোলোকে লাল কার্ড দেওয়া নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। ভিএআর দেখে দেওয়া সেই লাল কার্ডের পরই মূলত আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় সুইজারল্যান্ড।  

শুধু তাই নয়, এমন অনেক নিয়ম ও অফসাইডের মতো সূক্ষ্ম বিষয়কে মিলিমিটারের নির্ভুলতায় বিচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেগুলো মূলত কখনও এত সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের জন্য তৈরি করা হয়নি।

আরও বড় প্রশ্ন হলো- খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য বিনোদন। যদি নতুন নিয়ম বা প্রযুক্তি সেই আনন্দই কমিয়ে দেয়, তাহলে তার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

তবুও ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটি হবে না। কারণ ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিভিন্ন লিগ ইতোমধ্যেই ভিএআর প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। বরং অনেকের ধারণা, বর্তমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা দূর করতেও তারা আরও নতুন প্রযুক্তির দিকেই এগোবে।

রেফারিং নিয়েও অনেক বেশি বিতর্ক তেরি হয় এবারের বিশ্বকাপে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনাকে রেফারি সুবিধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে পুরো বিশ্বকাপজুড়ে। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউটের প্রতিটি ম্যাচে রেফারিরা মেসি এবং আর্জেন্টিনার প্রতি আনুকুল্য দেখিয়েছেন বলে প্রতিপক্ষ দলগুলোর কোচ, ফুটবলার এবং কর্মকর্তারা অভিযোগ তুলেছেন। যদিও ফিফা এসব অভিযোগ কোনো আমলেই নেয়নি।

৫. সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা কিলিয়ান এমবাপে

২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত অর্জনগুলোর একটি ছিল কিলিয়ান এমবাপের নতুন ইতিহাস গড়া। বিশ্বকাপ শেষে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ ম্যাচে ২২টি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ফাইনালে লিওনেল মেসি গোল করতে না পারায় রেকর্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের করে নেন ফরাসি এই তারকা।

আরও পড়ুন মেসির অর্ধেক বিশ্বকাপ খেলে সর্বোচ্চ গোল এমবাপের

এই রেকর্ড ভাঙা সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপে ৪৩ বছর বয়সী মেসি আরও গোল করে এমবাপেকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন- এমন কল্পনা করা গেলেও বাস্তবতা বলছে, সেটির সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে এমবাপের সবচেয়ে কাছাকাছি আছেন হ্যারি কেইন, যার বিশ্বকাপ গোল ১৪টি। কিন্তু কেইন এমবাপের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়।

অন্যদিকে জুদ বেলিংহ্যাম বয়সে চার বছরের ছোট হলেও তিনি একজন মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গোল করার গড় মেসির সমান (০.৬২) হলেও এখনও এমবাপের চেয়ে ১৪ গোল পিছিয়ে আছেন।

অর্থাৎ ভবিষ্যতে কেউ যদি এমবাপের রেকর্ড ভাঙতে চান, তাহলে তাকে হয় মেসির মতো অসাধারণ হতে হবে, নয়তো কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপে গোলের বন্যা বইয়ে দিতে হবে। ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামালকে এমন সম্ভাব্য উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে তিনি মাত্র একটি গোল করেছেন।

মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। শুধু তাই নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি করেছেন ১০ গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট- গত ৬০ বছরের মধ্যে এক আসরে সর্বোচ্চ ১৪টি গোলে অবদান।

আরও পড়ুন অবিশ্বাস্য এমবাপে, এক মৌসুমে তিন গোল্ডেন বুট!

তবুও এই অর্জনটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে না। কারণ সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে এমবাপে খুব একটা প্রভাব রাখতে পারেননি। আর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটি তিনি ভেঙেছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে, যে ম্যাচকে অনেকেই গুরুত্বহীন হিসেবে দেখেন।

ফলে ইতিহাসে এটি অবশ্যই একটি বড় পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, কিন্তু সম্ভবত ২০২৬ বিশ্বকাপের সংজ্ঞা হয়ে উঠবে না।

৪. যেভাবে বিশ্বজুড়ে সুপারস্টারে পরিণত হলেন আর্লিং হালান্ড

বিশ্বকাপের আগেও আর্লিং হালান্ড ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ তাকে নিয়ে গেছে একেবারে ভিন্ন উচ্চতায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংস্কৃতিতেও তিনি জায়গা করে নিয়েছেন।

এর একটি মজার উদাহরণও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ভাইরাল ছবিতে দেখা যায়, ২০০৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ক্লাব থেকে বের হচ্ছেন প্যারিস হিলটন, ব্রিটনি স্পিয়ার্স এবং আর্লিং হালান্ড। বাস্তবে অবশ্য হালান্ডের জায়গায় ছিলেন লিন্ডসে লোহান।

এ ধরনের ভাইরাল কনটেন্টই প্রমাণ করে, হালান্ড এখন শুধু ফুটবলের তারকা নন; তিনি পপ সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছেন। তার চেহারা অনেকের কাছে বাস্তবের এক ভাইকিং যোদ্ধার মতো। মাঠে যেমন শক্তিশালী, তেমনি মাঠের বাইরেও প্রাণবন্ত ও ক্যারিশম্যাটিক।

বিশ্বকাপ চলাকালে অন্য অনেক তারকার মতো নিজেকে গোপন না রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপ চলাকালে তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি। মাঠেও তিনি ব্রাজিলকে বিদায় করার মতো বড় কীর্তি গড়েছেন।

আরও পড়ুন আর্জেন্টিনাকে পাঠানো চিঠিতে কী লিখলেন ফিফা সভাপতি ইনফ্যান্তিনো?

তবে তার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে যায় শেষ ষোলোতেই। ফলে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যতই বেড়ে থাকুক, সেটি হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্প হিসেবে বিবেচিত হবে না।

৩. লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ!

যারা কেবল বিশ্বকাপের সময় ফুটবল দেখেন, তারা ২০২৬ বিশ্বকাপে যা দেখেছেন, সেটি হয়তো তাদের কাছে খুব পরিচিতই মনে হয়েছে। ২০২২ সালে যিনি ছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, চার বছর পর ২০২৬ সালেও তিনিই আবার ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার।

আর যারা সারা বছর ইউরোপিয়ান ফুটবল অনুসরণ করেন, তাদের কাছেও এটি নতুন কিছু নয়। লিওনেল মেসি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।

তবে বিস্ময়ের জায়গা অন্যখানে। ২০২২ সালের পর মেসিকে আর এমন উচ্চতায় দেখা যায়নি। অথচ ৩৯ বছর বয়সে এসে তিনি আবারও পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করলেন। ফাইনালে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে না পারলেও টুর্নামেন্টজুড়ে মেসিই ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল ফুটবলার।

তিনি একই সঙ্গে ছিলেন সেরা গোলদাতা, সেরা সুযোগ সৃষ্টিকারী, সেরা ড্রিবলার এবং অন্যতম সেরা পাসার। এমন পারফরম্যান্স এমন একজন ফুটবলারের কাছ থেকেই এসেছে, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বকে একইভাবে বিস্মিত করে চলেছেন।

 

তবুও ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্ভবত ‘মেসির বিশ্বকাপ’ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা পাবে না। কারণ ফাইনালে আর্জেন্টিনার নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স এবং ২০২২ বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই মেসির বিশ্বকাপ হিসেবে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্স ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকলেও, পুরো টুর্নামেন্টের পরিচয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

মেসির মত শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও। টানা ৬টি বিশ্বকাপ খেলা এবং প্রতিটি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপ চলাকালেই তিনি ঘোষণা করেছেন, এই বিশ্বকাপই তার শেষ।

কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। সে সঙ্গে বিশ্বকাপ থেকেও বিদায় নিয়েছেন সিআর সেভেন। যদিও বিদায় বেলায় ছিল তার চোখে অশ্রু। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার, ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে, এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও সব শিরোপা জয় করেছেন তিনি, শুধুমাত্র বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছাড়া।

এবার দুর্দান্ত একটি দল নিয়ে খেলতে গিয়ে কোয়ার্টারের বাধা পার হতে না পারা তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। কারণ, দলীয় সমন্বয়হীনতা। দলের মধ্যে একতা না থাকলে ভালো ভালো ফুটবলার নিয়েও যে ভালো কিছু করা যায় না, সে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এবার পর্তুগাল।

২. ইতিহাসের সেরা রক্ষণ, নাকি সর্বকালেরই সেরা দল- স্পেনকে ঘিরে সেই বিতর্ক

২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিচয় যদি কোনো দলের হয়ে থাকে, তাহলে সেটি স্পেনের অবিশ্বাস্য রক্ষণভাগ। একটি পরিসংখ্যানই বিষয়টি পরিষ্কার করে দেয়। টুর্নামেন্টের দুই সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের দুই সেরা গোলস্কোরার- লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপের বিপক্ষে স্পেন খেলেছে মোট ২১০ মিনিট।

আরও পড়ুন ম্যারাডোনা গেলেন যে পথে, মেসিও গেলেন সে পথে

এই দীর্ঘ সময়জুড়ে মেসি নিয়েছেন মাত্র একটি শট, এমবাপে তিনটি। চারটি শট মিলিয়ে প্রত্যাশিত গোল হওয়ার ছিল গড়ে মাত্র ০.১ এক্সজি (এক্সপেক্টেড গোল বা গোল হওয়ার সম্ভাবনা)। শুধু গোলের সুযোগই নয়, সতীর্থদের জন্যও তারা কিছু তৈরি করতে পারেননি। মেসি পুরো ম্যাচে বক্সের ভেতরে মাত্র দুটি সফল পাস দিতে পেরেছেন। এমবাপে একটি পাসও দিতে পারেননি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্পেন শুধু এই দুই সুপারস্টারকে থামিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। তাদের সতীর্থদেরও কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।

ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুই ম্যাচ মিলিয়ে স্পেন প্রতিপক্ষকে মাত্র ১২টি শট নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, যার সম্মিলিত গোলের সুযোগ ছিল মাত্র ০.৫৩ এক্সজি।

বিশ্বকাপজুড়ে- আটটি ম্যাচ এবং অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে- লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল প্রতিপক্ষকে মোট ৪৭টি শট নিতে দিয়েছে। এসব শট থেকে মোট প্রত্যাশিত গোল ছিল মাত্র ২.৩৬ এক্সজি। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি মাত্র ৫.৮টি শট এবং ০.৩ এক্সজি প্রতিপক্ষকে উপহার দিয়েছে স্পেন।

তুলনামূলকভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপে গড়ে প্রতিটি দল ম্যাচপ্রতি ১২.৫টি শট এবং ১.৫ এক্সজি তৈরি করেছে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি শটের মুখোমুখি হয়েছে যার এক্সজি ছিল ০.২ বা তার বেশি। সেটি ছিল ফাইনালে আর্জেন্টিনার হুলিয়ানো সিমিওনের শেষ মুহূর্তের শট, যা বারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়।

আরও পড়ুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে স্পেনের কাছ থেকে ব্রাজিলকে নিতে হবে ৫টি শিক্ষা

অন্যদিকে টুর্নামেন্টের প্রতিটি দল অন্তত তিনটি করে ০.২ এক্সজি বা তার বেশি মানের সুযোগ প্রতিপক্ষকে দিয়েছে। অথচ স্পেন খেলেছে অন্য সবার চেয়ে বেশি- আটটি পূর্ণ ম্যাচের সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ও।

ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে স্পেনের কীর্তি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্ট্যাটস পারফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দুটি দল স্পেনের চেয়ে কম এক্সজি প্রতিপক্ষকে দিয়েছে।

সেগুলো হলো ২০২২ সালের ব্রাজিল এবং ১৯৯০ সালের উরুগুয়ে। তবে সেই তুলনায় বড় পার্থক্যও রয়েছে। ২০২২ সালে ব্রাজিল খেলেছিল মাত্র পাঁচটি ম্যাচ। আর ১৯৯০ সালে উরুগুয়ের যাত্রা শেষ হয়েছিল চার ম্যাচেই। অন্যদিকে স্পেন খেলেছে আটটি পূর্ণ ম্যাচের পাশাপাশি অতিরিক্ত সময়ও।

উন্নত পরিসংখ্যান বাদ দিলেও স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো চ্যাম্পিয়ন দল এত বেশি ম্যাচ খেলেনি। আবার এত বেশি ম্যাচ খেলে মাত্র একটি গোলও কোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আগে হজম করেনি।

তবে স্পেনের রক্ষণ শুধু সংখ্যাতেই অনন্য নয়, তাদের রক্ষণভাগের ধরনও ছিল ব্যতিক্রমী। ২০০৬ সালের ইতালির মতো বিখ্যাত রক্ষণাত্মক দলগুলো মূলত নিজেদের অর্ধে নেমে প্রতিপক্ষকে ঠেকাত।

স্পেন করেছে ঠিক উল্টোটা। তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধেই খেলতে দেয়নি। আক্রমণাত্মক প্রেসিং, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং প্রতিপক্ষের ওপর লাগাতার চাপ- এই তিন অস্ত্রেই গড়ে উঠেছিল তাদের রক্ষণ।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন সংগঠিত হাই-প্রেস খুব কমই দেখা যায়। কারণ ক্লাবের মতো জাতীয় দলগুলো একসঙ্গে দীর্ঘ সময় অনুশীলনের সুযোগ পায় না। তবুও স্পেন সেটিকে প্রায় নিখুঁত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে বলের দখল ছিল স্পেনের ৭২.২ শতাংশ- কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সব দলের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। রক্ষণাত্মক চাপ পরিমাপের সূচক পিপিডিএ (Passes Per Defensive Action)-তেও সবার ওপরে ছিল তারা। প্রতিপক্ষকে মাত্র ৮.৮১টি পাস খেলতেই চাপ সৃষ্টি করেছে স্পেন, যা কোয়ার্টার ফাইনালের দলগুলোর মধ্যে সেরা। অর্থাৎ নিজেদের গোলপোস্টের সামনে নয়, প্রতিপক্ষের অর্ধেই রক্ষণ গড়ে তুলেছিল স্পেন।

সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এটি কি শুধু ইতিহাসের সেরা রক্ষণ, নাকি সর্বকালেরই সেরা জাতীয় দল? বর্তমানে স্পেন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে দীর্ঘতম অপরাজিত ধারার রেকর্ড। এমন এক সময়ে এই রেকর্ড এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

বিশ্বকাপ জয়ের পথে তারা টানা হারিয়েছে আগের দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে এবং প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য দেখিয়েছে। সবশেষে, বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ এলো রেটিং (Elo Rating, যার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আপেক্ষিক শক্তিমত্তা নির্ধারণ করা হয়) নিয়েই ২০২৬ আসর শেষ করেছে স্পেন।

এই সব পরিসংখ্যান একসঙ্গে বিবেচনা করলে বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু স্পেনের শিরোপা জয়ের গল্প নয়- এটি হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী একটি দলের জন্মের গল্পও।

১. এখান থেকেই কি ফুটবলের ‘আমেরিকানাইজেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো?

অদ্ভুত হলেও সত্যি, ইতিহাসে অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিই কোনো বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকে না।

স্পেন সম্ভবত সেই পথেই হাঁটছে। লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিঃসন্দেহে অসাধারণ একজন কোচ। ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্সের তুলনায় স্পেনের খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মান খুব বেশি এগিয়ে- এমনটা বলা যাবে না। কিন্তু মাঠে তাদের পারফরম্যান্স ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় স্পষ্টভাবে উন্নত। এই পার্থক্যের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই কোচের।

আরও পড়ুন কেমন হলো ইনফান্তিনোর ফুটবল বিশ্বকাপ, বাণিজ্য নাকি রাজনীতি?

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাস্তবতা হলো, জাতীয় দলের কোচরা সাধারণত বড় ক্লাবগুলোর লক্ষ্যবস্তু হন না। তাই দে লা ফুয়েন্তের ভবিষ্যৎও সম্ভবত ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশমের মতোই হবে- একজন সফল জাতীয় দলের কোচ, যিনি একটি স্বর্ণযুগ তৈরি করবেন, কিন্তু ফুটবল দর্শনের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া কোচ হিসেবে হয়তো পরিচিত হবেন না।

স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল- তারা সত্যিকার অর্থেই একটি দল। একজন নির্দিষ্ট সুপারস্টারের ওপর তাদের নির্ভরতা ছিল না। মাঠে যে-ই খেলুক না কেন, স্পেনের খেলার ধরন বদলায়নি।

বিশ্বকাপের আগে যদি কেউ বলতেন, লামিনে ইয়ামাল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল করবেন এবং একটি অ্যাসিস্টও পাবেন না, তাহলে অনেকেই হয়তো ধরে নিতেন স্পেন শেষ ষোলোর গণ্ডিই পার হতে পারবে না।

বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। ইয়ামাল তুলনামূলকভাবে নীরব ছিলেন, অথচ স্পেন ছিল পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী দল। এটাই প্রতিপক্ষদের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বার্তা।

কারণ ইয়ামালের বয়স এখনও খুব কম। ভবিষ্যতে তিনি আরও পরিণত ও বিধ্বংসী হয়ে উঠবেন। আর স্পেনের বর্তমান দলটিও তাদের শক্তি ধরে রাখবে। অনেকের মতে, যদি ইয়ামাল এই বিশ্বকাপে বিস্ফোরক পারফরম্যান্স দেখাতেন, তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসে ‘স্পেনের বিশ্বকাপ’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে যেত।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে বাজিমাত, এবার রিও প্রযুক্তি সম্মেলনে বক্তা হচ্ছেন ভোজিনহা

কিন্তু তা হয়নি। অন্যদিকে গোল্ডেন বলজয়ী রদ্রি বিশ্বমানের তারকা হলেও তার ব্যক্তিত্ব ও খেলার ধরন এতটাই নীরব ও সংযত যে, তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে খুব কমই থাকেন। অথচ তার ঝুলিতে আগেই ছিল ব্যালন ডি’অর।

অবশ্য ভবিষ্যতে এই বিশ্বকাপের মূল্যায়ন বদলাতেও পারে।

যদি লামিনে ইয়ামাল ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জিতে যান, তাহলে অনেকে হয়তো এই বিশ্বকাপকেই তার উত্থানের সূচনা হিসেবে মনে রাখবেন। আবার ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবার্সি যদি ভবিষ্যতে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেন্টার-ব্যাক হয়ে ওঠেন, তাহলে স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগের গল্পটিও নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সম্ভবত অন্য কিছু। অনেকের ধারণা, ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসে জায়গা করে নেবে সেই টুর্নামেন্ট হিসেবে, যেখান থেকে ফুটবলকে আরও বেশি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

অর্থাৎ ম্যাচের মধ্যে আরও বেশি বিরতি, আরও বেশি বিজ্ঞাপন এবং আরও বেশি আয়। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, প্রতি অর্ধে চালু হওয়া নতুন ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। কারণ, তার ভাষায়, ‘অনেকেই এই বিরতিগুলো পছন্দ করেননি।’

কিন্তু অন্য বাস্তবতাও রয়েছে। এই বিরতিগুলোর সময় বিজ্ঞাপন দেখিয়ে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ফক্স প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে। এত বড় অর্থের সম্ভাবনা সামনে থাকলে ফুটবল কর্তৃপক্ষ কি সত্যিই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে?

সাবেক টার্নার স্পোর্টস প্রধান ডেভিড লেভির মতে, সেটি খুবই কঠিন। তার ভাষায়, ‘হাইড্রেশন ব্রেক যদি আর্থিকভাবে এত কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে সেখান থেকে পেছনে ফেরা কঠিন হবে। আর যদি হাইড্রেশন ব্রেক না-ও থাকে, তাহলে অন্য কোনো উপায়ে একই কাজ করা হবে।’

আরও পড়ুন বিশ্বকাপ ফাইনালই ছিল মেসির শেষ ম্যাচ, সতীর্থের দাবিতে তোলপাড়

সব সমালোচনা, বিতর্ক আর শঙ্কার পরও ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত একটি সফল আসর ছিল। তবে সেই সফলতা শুধু টিকিট বিক্রি, স্পন্সর, টেলিভিশন রেটিং বা বিজ্ঞাপনের আয় দিয়ে মাপা যাবে না।

এই বিশ্বকাপ সফল হয়েছে আরও গভীর একটি কারণে। পৃথিবীর সেরা ফুটবলাররা আবারও কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে একত্রিত করেছিলেন। একটি ফুটবলকে ঘিরে এমন মানুষও একে অপরের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের হয়তো অন্য কোনো উপলক্ষ্যে কখনও দেখা হতো না।

বর্তমান পৃথিবীতে নানা কারণে মানুষ বিভক্ত। অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সংকট, সামাজিক দূরত্ব- সবকিছুর মধ্যেও বিশ্বকাপ ৪০ দিনের জন্য সেই বিভাজন ভুলিয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে মানুষকে দেখা গেছে আলজেরিয়ার সমর্থনে চিৎকার করতে।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কোমরসমান দাড়িওয়ালা একজন মানুষকে কিলিয়ান এমবাপে ও ফ্রান্স নিয়ে আলোচনা করতে শোনা গেছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা করতালি দিয়েছেন কেপ ভার্দের সমর্থকদের জন্য। ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের সমর্থকেরা একসঙ্গে উৎসব করেছেন।

কেউ একজন পরে এসেছিলেন অর্ধেক আর্জেন্টিনা, অর্ধেক অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্সি! এমনকি স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামালকে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালমার্টে কেনাকাটা করতে।

সব বিতর্ক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক জটিলতার পরও বিশ্বকাপের আসল আত্মা হারিয়ে যায়নি। আর সম্ভবত এ কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপকে ভবিষ্যতে মনে রাখা হবে এক দ্বৈত পরিচয়ে। একদিকে এটি ছিল এমন একটি বিশ্বকাপ, যা আবারও প্রমাণ করেছে ফুটবল মানুষের মধ্যে অদৃশ্য সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে।

অন্যদিকে এটিই হয়তো সেই বিশ্বকাপ, যেখানে ফিফা বুঝে যায়- খেলার নিয়মে সামান্য পরিবর্তন এনে ফুটবল থেকে আরও অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। তবুও শেষ পর্যন্ত একটি সত্য বদলায় না। ফিফা যতই বিতর্কিত হোক, যত নিয়মই পরিবর্তন করুক, ফুটবলের প্রাণ- একটি বলের গড়ানো- তারা কখনও থামাতে পারবে না। আর সেই কারণেই, যা-ই ঘটুক না কেন, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পরের বিশ্বকাপেও টেলিভিশনের সামনে বসবে।

আইএইচএস/