ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন জুলাই চললেও, বিশ্ব রাজনীতির শিরোনামগুলো যেন সেই এপ্রিলেই পড়ে রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাত সাময়িকভাবে থামলেও, যুদ্ধ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। শান্তিচুক্তির তিন সপ্তাহও হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই সেটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
Advertisement
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, অবরুদ্ধ অর্থ তহবিল এবং নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতার মধ্যে ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের এই খেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কেবলই সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন ইরান-ইউক্রেন-ইসরায়েল-ফিলিস্তিন-সৌদি: সব কি এক সূত্রে বাঁধা?গত ২৭ জুলাই সংবাদমাধ্যমকে দ্রুত চুক্তির কথা বললেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই আলোচনার জন্য তার ‘প্রচুর ধৈর্য ও সময়’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের পরির্বতনের সঙ্গে সঙ্গেই সুর বদলেছেন তিনি। এতে আলোচনা নিয়ে এক মুখে দুই ধরনের কথা বলে ট্রাম্প মূলত সময়ক্ষেপণ করছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
পরমাণু কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা আগামী ১৬ আগস্ট শেষ হতে যাচ্ছে। তবে এখনো কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়নি। ফলে ওমানের প্রস্তাব ইরান না মানলে উভয়সংকটে পড়বেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
Advertisement
এছাড়া, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কথা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় দুই দেশ আবার সংঘর্ষে জড়ায়।
আরও পড়ুন ইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮এর আগে, গত ৬ জুলাই কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলার মধ্য দিয়ে শান্তিচুক্তি ভেস্তে যেতে শুরু করে। ওমানের জলসীমায় থাকা হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ দিক দিয়ে জাহাজ চলাচল বেড়ে গিয়েছিল। ইরান সেটিই বন্ধ করতে চেয়েছিল বলে মত বিশ্লেষকদের।
এর জবাবে দক্ষিণ ইরানের সামরিক ঘাঁটি এবং অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে টানা দুই সপ্তাহ প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইরানও জর্ডান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
তবে, গত ২৪ জুলাই হঠাৎ সেই হামলা বন্ধ করে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এসময় মার্কিন প্রশাসন ইরানকে কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে সামরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় চিন্তায় পড়ে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানও নতুন কোনো হামলা চালায়নি।
Advertisement
এর মধ্যেই ওমান হরমুজ প্রণালি পরিচালনার বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেয় ইরানকে। সেখানে ১০ দিনের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি মালাক্কা প্রণালির মডেলে হরমুজ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবটিতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোরও সমর্থন রয়েছে। তবে ওমানের এই প্রস্তাব মেনে নিলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর আর একক কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না ইরানের। ফলে এটি বাস্তবায়ন হলেও এইনিয়ে পরবর্তীতে নতুন করে বিবাদ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন ট্রাম্পের কথা শুনলেই বিপদ! হরমুজে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেবে ইরানএছাড়া, নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে রাখা ইরানি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। যদিও চুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা তেহরানের। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন শর্ত সাপেক্ষে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড়ার নীতিতে অটল রয়েছে।
কাজেই অর্থনৈতিক চাপ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি হলেও শর্তের অস্পষ্টতায় তা ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। মূল সমস্যাগুলো অপরিবর্তিত থাকায় নতুন কোনো চুক্তির সফলতা নিয়েও তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টআরএইচ/কেএএ/