দেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্যের বাজার আছে। প্রতি বছর প্লাস্টিকের চাহিদা প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশে ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশ রিসাইকেল থেকে পূরণ করা হয়। ফলে এসব বর্জ্য পুড়িয়ে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাহলে সাড়ে সাত লাখ মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়বে।
Advertisement
ফলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও বর্জ্যজীবীদের কর্মসংস্থান রক্ষায় বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জ্বালানি পুনরুদ্ধার যেন জনস্বাস্থ্য, পুনর্ব্যবহার কিংবা বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জীবিকার মূল্যে না আসে। বাংলাদেশের উচিত বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং ও জিরো ওয়েস্ট পদ্ধতি জোরদার করা। পাশাপাশি এমন একটি ন্যায্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেন কেউ পিছিয়ে না থাকে।
বুধবার (২৯ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে ‘বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন: পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, রিসাইক্লিং এবং বর্জ্যজীবীদের জীবিকার ওপর প্রভাব’ শীর্ষক বর্জ্যজীবীদের সঙ্গে এক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গ্রাম বাংলা উন্নয় কমিটি, আর্থ ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল গ্রিনগ্রান্টস ফান্ড, জিএআইএ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ওয়েস্ট পিকার্স ও বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়ন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়নের সভাপতি রীনা বেগম ও সাধারণ সম্পাদক কুলসুম বেগম, বিএমএসএফের নির্বাহী পরিচালক খায়রুজ্জামান কামাল, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ, গ্রাম বাংলা ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ রাসুল ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বারিশ চৌধুরী। আর্থ ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এ কে এম মাকসুদ।
Advertisement
সভায় এ কে এম মাকসুদ বলেন, বর্জ্য পোড়ানোর কারণে ব্যাপকভাবে বায়ুদূষণ হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়েও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন মরণব্যাধি বৃদ্ধি পাবে। চার টন বর্জ্য পোড়ালে এক টন বিষাক্ত ছাই উৎপাদন হবে, যেটা পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, কৃষি জমি, বায়ু ও পানিতে মিশে আরও ভয়ংকভাবে ক্ষতি করবে। ফলে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনো সমাধান নয়। বরং এটার কারণে অর্থের অপচয় ও লাখ লাখ মানুষ জীবিকা হারাবে। ফলে এসব প্রকল্প বন্ধ করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিং করে বর্জ্যের প্রকৃত ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা এবং থ্রি আর স্ট্রাটেজি বাস্তবায়ন জরুরি।
আরও পড়ুন ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে ভ্যানে ময়লা নেওয়ার ফি বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিটরীনা বেগম বলেন, ‘আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির বিপক্ষে না। তবে যে কোনো নতুন প্রকল্পে আমাদের কাজ, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পটি এগিয়ে গেলে সরকারকে অবশ্যই বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জন্য বিকল্প জীবিকা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’
কুলসুম বেগম বলেন, ‘আমরা ময়লা থেকে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু এগুলো অন্য কাজে না লাগিয়ে যদি পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাহলে আমরা আমাদের আয় কীভাবে হবে? আমাদের কর্মহীন না করার দাবি জানাই।’
সভায় খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, বিশ্বে বর্তমানে বছরে প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন টনে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বছরে আনুমানিক ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হবে। তাই পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমাধান জরুরি।
Advertisement
সভায় ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল বর্জ্যের ভাগাড় এলাকা থেকে ২০ জন বর্জ্যজীবী অংশগ্রহণ করেন। এসময় তারা ভাগাড় থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করার অধিকার, সিটি করপোরেশনে চাকরি ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ সংগঠন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষকসহ অর্ধশতাধিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিনিধিরা একত্র হন।
ইএইচটি/একিউএফ