‘আমার বাবা গ্ৰামে একটি দোকান পরিচালনা করেন। মা গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় আমার পড়াশোনার খরচ বহন করতে পারেন না। অনেক সময় সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই পরিবারের কাছ থেকে কোনো টাকা নিতে চাই না। বর্তমানে তিনটি টিউশনি করাই। সেই অর্থ দিয়েই মেস ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বই-খাতা ও অন্যান্য খরচ চালাই। অনেক কষ্ট হলেও নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি।’
Advertisement
এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাব্বি হোসেন। তার মেস ভাড়া, খাবার, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত, বই-খাতা ও অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ বাবদ মাসে ৮-১০ হাজার টাকা দরকার হয়। কিন্তু তার পরিবারের পক্ষে এই টাকা নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হয় না। এজন্য টিউশনি করেন তিনি।
‘পরিবার থেকে আগের মতো নিয়মিত টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই তিনটি টিউশনি করি। মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর চাপও কিছুটা কমাতে পারছি। তবে সময়ের অভাবে নিজের পড়াশোনায় বাড়তি মনোযোগ দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আবাসন ব্যয়, যাতায়াত খরচ এবং শিক্ষাসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষার্থীদের জীবনেও। পরিবারের সীমিত সামর্থ্য, উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং ব্যক্তিগত খরচ সামলাতে অনেক শিক্ষার্থী এখন পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি ও বিভিন্ন খণ্ডকালীন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাদের কাছে এসব কাজ এখন শুধু অতিরিক্ত আয়ের উৎস নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন টিকিয়ে রাখার অন্যতম অবলম্বন।
Advertisement
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই মাসে দুই থেকে চারটি টিউশনি করছেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পার্ট-টাইম চাকরি করছেন। এসব কাজ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে মেস ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, ইন্টারনেট বিল, বই-খাতা এবং অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয় নির্বাহ করছেন তারা।
আরও পড়ুন বয়স চল্লিশের আগেই আপনার আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করুনঅর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহানের পরিবারে পাঁচজন সদস্য। বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় নিয়মিত আয় নেই। তাই শিক্ষার খরচ নিজেই চালাতে হচ্ছে।
‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু পরিবারের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন। তাই টিউশনি এখন আমাদের কাছে প্রয়োজন, বিলাসিতা নয়’
নুসরাত জাহান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমার মেস ভাড়া ২৫০০ টাকা, খাবার ৩০০০, যাতায়াত ১০০০-১২০০, ইন্টারনেট ও মোবাইল বিল ৫০০, বই-খাতা ও ফটোকপি ১২০০, ব্যক্তিগত ও অন্যান্য খরচ ১৫০০-২০০০ টাকা। সব মিলিয়ে মাসে ১০৫০০–১২০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষে আমাকে টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই টিউশনি করছি। কখনো দুটি, কখনো তিনটি টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার সব খরচ চালাতে হয়।’
Advertisement
তিনি বলেন, ‘ক্লাস, পরীক্ষা ও টিউশনির মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হলেও শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়ার জন্য অন্য কোনো বিকল্প নেই। আমি চাই, পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে।’
মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিবার থেকে আগের মতো নিয়মিত টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই তিনটি টিউশনি করি। মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর চাপও কিছুটা কমাতে পারছি। তবে সময়ের অভাবে নিজের পড়াশোনায় বাড়তি মনোযোগ দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।’
আরও পড়ুন টাকার ৭টি মৌলিক নীতি যা আপনাকে ধনী হতে সহায়তা করবেঅনলাইনে কনটেন্ট লেখার কাজ করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবিহা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর কাজ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে বেশ চাপ নিতে হয়। তবুও নিজের খরচ নিজে বহন করতে পারছি—এটিই সবচেয়ে বড় অর্জন।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সক্ষমতার কারণে সবাইকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হলেও যেসব শিক্ষার্থী চরম সংকটে পড়ে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি’—ছাত্র পরামর্শ কেন্দ্রের পরিচালক
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব হাসানের ভাষ্য, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু পরিবারের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন। তাই টিউশনি এখন আমাদের কাছে প্রয়োজন, বিলাসিতা নয়।’
আরও পড়ুন জাতিসংঘের ক্ষোভ / ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দিয়ে ৮ কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো যেতশিক্ষার্থীরা বলছেন, নিয়মিত কাজের কারণে সময় ব্যবস্থাপনা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা ও খণ্ডকালীন কাজের সমন্বয় করতে গিয়ে অনেকেই মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে ভুগছেন। তবুও ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণে এই সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানো, জরুরি আর্থিক সহায়তা তহবিল, গবেষণা সহকারী নিয়োগ, ক্যাম্পাসভিত্তিক খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক চাপ অনেকাংশে কমে আসবে। একইসঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
আরও পড়ুন সন্তান নিতে চান না, দাম্পত্য জীবনের নতুন ট্রেন্ডএ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. নাজমুল কায়েস জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে টিউশনি ও খণ্ডকালীন কাজ আর কেবল অতিরিক্ত আয়ের মাধ্যম নয়; এটি তাদের উচ্চশিক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন টিকিয়ে রাখার এক অনিবার্য সংগ্রামের নাম।’
তিনি বলেন, ‘সীমিত সামর্থ্য আর অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছে। এটি তাদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণে সহায়ক হবে।’
আরও পড়ুন সময়ের সঠিক ব্যবহার বদলে দেবে জীবননাজমুল কায়েস বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সক্ষমতার কারণে সবাইকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হলেও যেসব শিক্ষার্থী চরম সংকটে পড়ে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী যেন আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে না পড়ে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধি, স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালু, গবেষণা সহকারী নিয়োগ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’
এসআর/জেআইএম