মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। প্রণালিটির যৌথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় হরমুজের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে ইরানের হাতে।
Advertisement
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, ওমানের প্রস্তাব ইরানের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি। তাই তেহরান নিজস্ব পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই মতবিরোধ শুধু ইরান ও ওমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
Advertisement
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যেত।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে।
১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলেও সেখানে হরমুজ পরিচালনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় নতুন বিরোধ তৈরি হয়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা দেখা দেয়। যদিও গত সপ্তাহে সেই সংঘাত আপাতত থেমেছে, তবে কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলছে।
ওমান কী প্রস্তাব দিয়েছে?
Advertisement
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওমান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দুই দেশের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এই পরিকল্পনায় ইরানের উপকূলসংলগ্ন নৌপথ পরিচালনা করবে তেহরান এবং ওমানের উপকূলঘেঁষা অংশ পরিচালনা করবে মাসকাট।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছা ভিত্তিতে ফি নেওয়া হবে। সেই অর্থ দুই দেশ যৌথভাবে ব্যবহার করবে নৌ চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায়।
ওমানের পরিকল্পনাটি মালাক্কা প্রণালির ব্যবস্থাপনা থেকে অনুপ্রাণিত। সেখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর স্বেচ্ছা অনুদানের মাধ্যমে নৌপথ পরিচালনার ব্যয় বহন করে।
এদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওমানের প্রস্তাবটি ওই দেশগুলোরও সমর্থন পেয়েছে।
ইরানের পাল্টা প্রস্তাব কী?
তবে ওমানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি তেহরান। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি নৌপথ পুরোপুরি ইরানের জলসীমার মধ্যে থাকবে। অন্য পথেরও একটি অংশ ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে, যাতে প্রবেশ ও প্রস্থান—উভয় দিকের জাহাজ চলাচলের ওপর কার্যকর নজরদারি রাখতে পারে তেহরান।
গারিবাবাদি বলেন, ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওমান যদি ইরানের প্রস্তাব না মানে, তাহলে হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। পাশাপাশি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতো বিনা ফিতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
নতুন সমঝোতার চেষ্টা
ওমান এখন নতুন আরেকটি বিকল্প পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। সেই পরিকল্পনায় তিনটি পৃথক নৌপথ রাখার ধারণা রয়েছে—একটি পুরোপুরি ইরানের জলসীমায়, একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং আরেকটি ওমানের জলসীমায়।
ইরান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আলোচনায় তেহরান আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় অবস্থান দেখাচ্ছে।
কোন বিষয়গুলোতে এখনো মতবিরোধ?
শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
কোন পথে জাহাজ চলবে।প্রণালি ব্যবহারের জন্য কী ধরনের ফি নেওয়া হবে।সেই ফি কে নির্ধারণ ও সংগ্রহ করবে।যুদ্ধ চলাকালে পাতা থাকতে পারে এমন সমুদ্র-মাইন অপসারণের দায়িত্ব কার হবে।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ইরান হরমুজে মাইন পেতেছে। যদিও তেহরান এ অভিযোগ স্বীকার করেনি।
তবে যুদ্ধের সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) অনুমোদিত জাহাজ চলাচলের একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। সেখানে জাহাজগুলোকে ইরানের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করতে বলা হয়, যাতে সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে চলা যায়।
ফি নিয়েও বিতর্ক
হরমুজ ব্যবহারের জন্য কত টাকা নেওয়া হবে, সেটিও বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মালাক্কা প্রণালিতে স্বেচ্ছা অনুদান থেকে বছরে প্রায় সাত কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়।
অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ দিয়ে যাওয়া প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত সেবা ফি নেওয়ার চিন্তা করছে।
তেহরান এর আগে জানিয়েছিল, এই অর্থ যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে।
সমঝোতা না হলে ঝুঁকি বাড়বে
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমে থাকলেও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের নিয়ম নিয়ে মতবিরোধ এখনো কাটেনি। ফলে সামরিক সংঘাত আপাতত কমলেও কূটনৈতিক লড়াই যে এখনো শেষ হয়নি, সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম