ড. কে এম আতিকুর রহমান
Advertisement
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানান ধরনের সংকট বিদ্যমান। এসব সংকটের প্রভাবে শিক্ষা ও গবেষণা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বড় বড় কলেজগুলোতেও এমন অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার মধ্যে রয়েছে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি, শিক্ষা ও গবেষণার অনুকূল লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত, দুর্বলতা, শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব, সনাতনী একাডেমিক বিভাগ ও কারিকুলাম এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অধিকাংশ একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা।
উপরোক্ত সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনা এবং দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আবার অনেক সমস্যা তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব। যেমন-‘স্মার্ট শিক্ষার্থী কার্ড’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে চালু করা হলে প্রায় ২৫ শতাংশ একাডেমিক এবং প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত অনেক শিক্ষার্থী অবৈধভাবে রুম দখল করে রয়েছে। বার বার রি-অ্যাডমিশন নেয় শুধু আবাসিক হলে থাকার জন্য, হলের ক্যান্টিনে এবং ক্যাফেটেরিয়াতে ফ্রি খাওয়ার জন্য। অনেকেই ক্যাম্পাসের টং দোকান হতে বাকি খাচ্ছে কিন্তু টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করছে না। বাংলাদেশের প্রায় সব ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আনাগোনা একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
Advertisement
অনেক ক্যাম্পাস ছিনতাইকারী, মাদকাসক্ত ও ভিখারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আবার ক্যাম্পাসের ভেতরে অবাঞ্ছিত গাড়িঘোড়া চলাফেরা করায় নানা একাডেমিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে সিট ব্যবস্থাপনার কোন ডিজিটাল পদ্ধতি নেই। ক্যাম্পাসে নেই বিল পরিশোধ করা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার ডিজিটাল পদ্ধতি। এসব সমস্যা একটি স্মার্ট শিক্ষার্থী কার্ডের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।
স্মার্ট শিক্ষার্থী কার্ড হলো একটি চিপ-যুক্ত আধুনিক পরিচয়পত্র যা প্রচলিত প্লাস্টিকের বা কাগজের আইডি কার্ডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু নাম, কিছু তথ্য ও ছবি দেখানোর পরিবর্তে, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত তঠ্য ভাণ্ডার, ডিজিটাল চাবি, ওয়ালেট এবং ডাটা ট্র্যাকার হিসেবে কাজ করে। এটি কীভাবে কাজ করে এবং শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কুল প্রশাসকদের জন্য এর প্রধান সুবিধাগুলো নিচে দেওয়া হলো।
শিক্ষার্থীদের যেসব সুবিধা পেতে পারেনশ্রেণীকক্ষে প্রবেশের জন্য শিক্ষার্থীদের আলাদা চাবি, লাইব্রেরি কার্ড, খাবারের টোকেন এবং বাস পাস বহন করার প্রয়োজন নেই। স্মার্ট কার্ডের একটি মাত্র পাঞ্ছের মাধ্যমে সবকিছু সম্পন্ন হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের কার্ডের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব যুক্ত করে ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের বিল, ক্যাম্পাসের দোকান থেকে বই কেনা, অথবা প্রিন্টিং ও ভেন্ডিং মেশিনের বিল পরিশোধ করতে পারা যায়। ক্যাম্পাস হবে নগদ টাকায় পরিশোধবিহীন এক ক্যাশলেস শিক্ষাঙ্গন। এর ফলে নগদ টাকা বা মানিব্যাগ বহন করার প্রয়োজন হয় হবে না। খুচরা টাকার ঝামেলা থাকবে না, টাকা হারনোর ঝুঁকিও প্রায় শূন্য। ক্যাফেটেরিয়া, ক্যান্টিন বা বইয়ের দোকানে কার্ড ট্যাপ করে নগদ টাকা লেনদেন বা ক্রেডিট কার্ড প্রসেস করার চেয়ে অনেক দ্রুত হয় যা ক্লাসের মধ্যে অপেক্ষার সময়কে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। লাইব্রেরিতে প্রবেশ, লাইব্রেরি থেকে বই ধার করা, ক্যাম্পাসের কম্পিউটারে লগ ইন করা বা রিডিং সীট বুক করা একটি স্ক্যানের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা যাবে।
অভিভাবকদেরও সুবিধাস্মার্ট কার্ডে অভিভাবকগণ তার সন্তানদের রিয়েল-টাইম নিরাপত্তা সতর্কতা নোটিফিকেশন পেয়ে থাকে। অনেক স্মার্ট কার্ড সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিভাবকদের কাছে একটি এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশন পাঠায়, যখন তাদের সন্তান সকালে ক্যাম্পাসের গেটে স্ক্যান করে প্রবেশ করে এবং দিনশেষে স্ক্যান করে বেরিয়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে। সন্তান রাস্তাঘাটে বা ক্যাম্পাসে বিপদে পড়লে অভিভাবকগণ নিরাপত্তা সতর্কতা নোটিফিকেশন পায়। এতে দ্রুত ও সহজে উদ্ধার টিম সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
Advertisement
অভিভাবকরা সহজেই ডিজিটালভাবে কার্ডে টাকা যোগ করতে পারেন এবং লেনদেনের ইতিহাস দেখে নিতে পারেন। তাদের সন্তানরা ঠিক কীসের উপর টাকা খরচ করছে (যেমন-তারা ক্যান্টিনে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনছে কি না তা নিশ্চিত করা) তা তারা জানতে পারে।
কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য প্রধান সুবিধা হলো শিক্ষার্থীদের স্বয়ংক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারা। শিক্ষকদের প্রতিটি ক্লাসের প্রথম ৫-১০ মিনিট রোল কল করার পরিবর্তে, শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটি রিডার মেশিন তাদের কার্ড ট্যাপ বা পাঞ্চ করে। ডাটা তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলের ডাটাবেসে জমা হয়ে যায়, যা পাঠদানের মূল্যবান সময় বাঁচায়। স্মার্ট কার্ড ক্যাম্পাসের ভবন, ডরমিটরি এবং ল্যাবে প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করে।
আরও পড়ুন বিদেশে পড়তে গেলে যে কারণে আমাদের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়শুধু অনুমোদিত কার্ডধারীরাই সুরক্ষিত দরজা খুলতে পারে, যা অনুপ্রবেশকারীদের বাইরে রাখে। কার্ড হারিয়ে গেলে, অননুমোদিত ব্যবহার রোধ করতে এটি অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে। প্রশাসকরা লাইব্রেরির ব্যবহার, ক্যাফেটেরিয়ার ব্যস্ততম সময় বা উচ্চ অনুপস্থিতির মতো প্রবণতাগুলো দেখে স্কুলের কর্মী নিয়োগ, বাজেট এবং সম্পদ সম্পর্কে আরও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এখানে চীনের সাংহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক ডিজিটালাইজ করা আছে। গেট দিয়ে প্রবেশ করার জন্য সবাইকে কার্ড পাঞ্চ করে প্রবেশ করতে হয়। শিক্ষক-কর্মচারী অথবা ছাত্র-ছাত্রী সবাইকেই এই প্রক্রিয়া অনুসরন করতে হয়। এরপর আসা যাক আবাসিক হলগুলোতে প্রবেশের বিষয়। আবাসিক হলগুলোর প্রবেশদ্বার এবং নিজের আবাসিক কক্ষে কার্ড পাঞ্চ করা ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এখানে ম্যানুয়াল কোন তালা বা চাবির ব্যবহার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যত কেনাকাটা বা লেনদেন আছে সেগুলো স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করেই পরিশোধ করা যায়। লাইব্রেরিতে কোনো শিক্ষার্থী বা কর্মচারী প্রবেশ করতে গেলে তাকে কার্ড পাঞ্চ করতে হবে। রিডিং সিট বুক করা, ফটোকপি করা, বই ধার নেওয়া এবং জমা দেওয়া কার্ড পাঞ্চ করা ব্যতীত সম্ভব নয়। ক্যান্টিনে খাওয়ার জন্য স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে বিল পরিশোধ করতে হয়।
স্মার্ট শিক্ষার্থী কার্ড চালু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ধরনের বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কার্ড চালু করা প্রায় অসম্ভব। যেমন-বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে স্মার্ট শিক্ষার্থী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিলে প্রথম বাঁধাটাই আসবে রাজনীতির পক্ষ থেকে। এছাড়া দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সব শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী এতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। স্মার্ট কার্ড চালু হলে দলীয় শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না। কারণ স্মার্ট কার্ড ছাড়া কেউ আবাসিক হলে প্রবেশ করতে পারবে না। ক্যাফেটেরিয়ায় ফ্রী খেতে পারবে না ও বই ধার নিতে পারবে না। আবাসিক হল ও প্রশাসন ভবনে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের যে মূল ফটক আছে সেটাই অতিক্রম করতে পারবে না।
তাই এই কায়েমী স্বার্থগোষ্ঠী নিঃসন্দেহে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্য হয়। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারলে কেউ এসব প্রকল্প হতে চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজি করতে পারবে না। এজন্যই কার্ড প্রচলন করার ক্ষেত্রে স্বার্থগোষ্ঠী বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এমনকি বাংলাদেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ক্যাম্পাসে এই ধরনের কার্ড চালু করা অসম্ভবও হতে পারে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সোনাগাজি সরকারি কলেজ, ফেনী
কেএসকে