বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দেয়া এবং ফিফার বাণিজ্যিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এবার সদস্য দেশগুলোর ফুটবল ফেডারেশনকে সরাসরি হুমকি দিয়ে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। চিঠি পাঠিয়ে তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যদি ২১১টি সদস্য ফেডারেশন তার প্রস্তাবে সম্মতি না দেয়, তাহলে তারা অতিরিক্ত ৪০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নয়ন তহবিল পাওয়ার সুযোগ হারাবে।
Advertisement
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস প্রথম এই চিঠির খবর প্রকাশ করে। পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, ইনফান্তিনো সদস্য ফেডারেশনগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে এই পরিকল্পনাকে ফুটবলের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক ও অনন্য অর্থায়নের সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কী এই পরিকল্পনা?
ফিফা একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছে, যার সম্ভাব্য নাম ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FIFA Forward Enterprise- FFE)। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য হবে ২০ বিলিয়ন ডলার এবং এর ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে।
Advertisement
নতুন প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক অধিকার ও আয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিফা ১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন তহবিল সংগ্রহ করতে চায়, যা সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।
অনুমোদন পেলে কী সুবিধা?
ইনফান্তিনোর চিঠিতে বলা হয়েছে, পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন অর্থায়ন কার্যকর হবে। প্রতিটি সদস্য ফেডারেশন সর্বোচ্চ ৪০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারবে। এর মধ্যে- ২০ মিলিয়ন ডলার এককালীন ফাস্ট ফরোয়ার্ড (Fast Forward) তহবিল এবং ২০ মিলিয়ন ডলার ২০২৭ থেকে ২০৩০ চক্রের ফিফা ফরোয়ার্ড (FIFA Forward) উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সদস্যরা যদি এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে মোট উন্নয়ন তহবিল সীমাবদ্ধ থাকবে ২.৭ বিলিয়ন ডলারে।
Advertisement
সদস্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে ইনফান্তিনো লিখেছেন, ‘ফিফা সভাপতি হিসেবে এমন যুগান্তকারী সুযোগ সদস্যদের সামনে তুলে ধরা আমার দায়িত্ব। যদি আপনারা এই পরিকল্পনায় সম্মতি দেন, তাহলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন কার্যকর হবে এবং আমরা উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করব। আর যদি বর্তমান অবস্থাই বজায় রাখতে চান, তাহলে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২.৭ বিলিয়ন ডলারের ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচিই চালু থাকবে।’
ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন
এই প্রকল্পের অন্যতম সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল (Thrive Capital)। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এ সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর পরিকল্পনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।
উয়েফার তীব্র আপত্তি
ফিফার এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার হয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ইনফান্তিনোর চিঠি প্রকাশের পর বুধবারই এক বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, ‘আজ আমরা জানতে পেরেছি, ফিফা সদস্য সংস্থাগুলোকে বলেছে- তাদের প্রস্তাব সমর্থন না করলে এককালীন অর্থ সহায়তার সুযোগও থাকবে না। এই একটি ঘটনাই পুরো পরিকল্পনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।’
উয়েফা আরও অভিযোগ করে, ‘ফুটবলের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনায় আমরা দেখেছি, ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিরোধিতা দ্রুত বাড়ছে। ফিফা আর নিজেদের এবং তাদের ঘনিষ্ঠদের সমৃদ্ধ করার জন্য ফুটবলকে ব্যবহার করতে পারে না। ফুটবলকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার উপায় রয়েছে। এখন সময় এসেছে সদস্য সংস্থা, ক্লাব, লিগ, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।’
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে উয়েফা তাদের ৫৫টি সদস্য ফেডারেশনকে জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে ডাকতে পারে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপও বিবেচনায় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইংল্যান্ডেরও ক্ষোভ
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)ও পরিকল্পনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ‘আমরা এই প্রস্তাব সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই জানতাম না। এখনও পর্যন্ত প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমাদের কাছে নেই। সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এই পুরো প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং এর মূল নীতিগত দিক নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
এফএ আরও বলেছে, ফিফা যখন সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পুরো প্রস্তাব উপস্থাপন করবে, তখন তারা আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে। এর আগে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
বিশ্বকাপসহ ফিফার সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক অধিকার আংশিকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফিফা বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ পাবে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
তবে উয়েফা, ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং আরও কয়েকটি সংস্থার আশঙ্কা, এতে ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে চলে যাবে এবং বিশ্বকাপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা বিনিয়োগকারীদের সম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আইএইচএস/