ক্যাম্পাস

ছাত্রত্ব শেষেও হলে থাকতে পারবেন জাকসু নেতারা, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি

ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পদের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত হলে অবস্থানের সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

Advertisement

অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রত্ব না থাকা জাকসু ভিপির হলে অবস্থানকে বৈধতা দিতেই প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন জাকসুর নির্বাচিত নেতাদের কয়েকজন।

বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাকসু ও হল সংসদের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা তাদের সংশ্লিষ্ট পদের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দকৃত হলে অবস্থান করতে পারবেন।

আরও পড়ুন হল ছাড়লেন জাকসুর জিএস, সময় চাইলেন ভিপি

তবে এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষার্থী শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ ২০১৮-এর সরাসরি পরিপন্থি। অধ্যাদেশের ৫ (ট) ধারা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র, চিকিৎসা ও গ্রন্থাগার কার্ড ফেরত দিয়ে আবাসিক হল ত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় শাস্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রাখার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

Advertisement

বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের অনেকে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে ‌‘বৈষম্যমূলক’ ও ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব শেষ হলে যেখানে হল ছাড়তে হয়, সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

এদিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর জাকসুর বেশিরভাগ নেতা প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করেছেন। জাকসুর সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক আহসান লাবিব বলেন, ‘এরকম কোনো অন্যায় দাবি জাকসু থেকে আমরা করিনি। কার পরামর্শে এবং কোন আইনের বলে এসব করা হচ্ছে? আমরা এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছি। অফিস আদেশটি প্রত্যাহার করা হোক।’

জাকসুর সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, ‘ছাত্রত্ব শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী হল ছাড়তে হয়। কোনো শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বা অন্য কারও জন্য অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অধিকার কারও নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। এটি শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে, যা অগ্রহণযোগ্য।’

Advertisement

এ বিষয়ে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের হঠাৎ ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে আমরা অবাক হয়েছি। জাকসু বডির সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। জাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন না করে এবং গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর মাধ্যমে হলে অবৈধ অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

ছাত্রশক্তির জাবি শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান ফেসবুকে তার এক পোস্টে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, জাকসুর ভিপির ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি হলে অবস্থান করছেন। তাহলে কি প্রশাসন এখন শুধু ভিপিকে সুবিধা দিতে নিয়ম পরিবর্তন করেছে? সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক নিয়ম, আর জাকসু ও হল সংসদের নেতাদের জন্য আরেক নিয়ম—এটাই কি প্রশাসনের নীতি?’

প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করছেন অন্যান্যা ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারাও।

ছাত্রদল জাবি শাখার সভাপতি জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্ক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মহামান্য জাকসু এবং হল সংসদ প্রতিনিধিদের জন্য কি আলাদা ভিআইপি প্যাকেজ চালু হলো? যেখানে ছাত্রত্ব চলে যাওয়ার পর পদে থাকাটাই অবৈধ, সেখানে প্রশাসন তাদের সহায়তা করে ঘটা করে অ্যানাউন্সমেন্ট দেয় হলের রুমে থাকার জন্য!’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একজন বৈধ শিক্ষার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তার ছাত্রত্ব শেষ হলেও তিনি এক বছরের জন্য ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে হলে অবস্থান না করলে তাদের পক্ষে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রশাসনিক সভায় জাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত হলে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাদের মেয়াদ আর মাত্র দুই থেকে তিন মাস বাকি। এটি কোনো একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

রকিব হাসান প্রান্ত/এসআর/জেআইএম