স্বপ্ন ছিল বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করবেন। সেই আয় দিয়ে সংসারের অভাব দূর করবেন। সেইসঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ভাগ্য ফেরাবেন। আর তাই বৈধ কিংবা অবৈধ কোনো চিন্তা না করেই পাড়ি জমান সুদূর প্রবাস দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রবাস জীবনই যেন তাদের কাল হলো। আগুনে শুধু স্বপ্ন নয়, নিজেরাও হলেন পুড়ে অঙ্গার।
Advertisement
দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ ১২ বছর কাটিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর এলাকার বাসিন্দা মো. হৃদয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের শম শহরের যে দোকানে অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন সেখানে মো. হৃদয়ও কিছুদিন কর্মরত ছিলেন।
মো. হৃদয় বলেন, সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকায় বৈধ উপায়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজের ভিসা পাওয়া যায় না। টুরিস্ট ভিসায় গেলে বৈধ উপায়ে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। আর দুবাই, মোজাম্বিক ও কেনিয়াসহ কয়েকটি দেশের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দালালের মাধ্যমে গেলে ৮ লাখ টাকায় যাওয়া যায়। তারপর সেখানে গিয়ে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করা হয়। সেইসঙ্গে সেই দেশের সরকারও ওয়ার্ক পারমিটের অনুমোদন দেয়। সে হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা যায় তাদের বেশিরভাগই অবৈধ প্রক্রিয়ায় গিয়ে থাকে।
আরও পড়ুন দক্ষিণ আফ্রিকায় দোকানে আগুন, ৬ বাংলাদেশি নিহতএলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফতুল্লা আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর এলাকার প্রায় প্রত্যেক ঘরেই একজন করে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী রয়েছেন। ওই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের দক্ষিণ আফ্রিকায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর তার মাধ্যমে এলাকার লোকজন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে তার মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন।
Advertisement
এদিকে ওই দোকানে আগুন লাগার দুইটি কারণ ধারণা করা হচ্ছে। প্রবাসী মো. হৃদয় বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় শীতের মৌসুম চলছে। দোকানের ভেতরে অনেক ইলেক্ট্রিক জিনিসপত্র রয়েছে। সেখান থেকে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে।
আরেকটি কারণ হতে পারে- বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনকারীরাও আগুন লাগাতে পারে। কারণ তারা বিদেশি সহ্য করতে পারে না।
মো. হৃদয় জানান, আগুনে পুড়ে ৬ বাংলাদেশির মারা যাওয়ার ঘটনায় দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের শম শহরেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওই শহরের প্রবাসীরা দোকানপাট বন্ধ করে ৬ বাংলাদেশির জন্য শোক পালন করছেন। তারা এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না। একইসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর এলাকাতেও যেন শোক চলছে। চারদিকে নীরবতা বিরাজ করছে।
স্থানীয় মেম্বার ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভাই রওশন আলী বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা সবাই আমার আত্মীয়স্বজন। কীভাবে আগুন লাগছে সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এই ঘটনায় আমাদের সরকার খুবই আন্তরিক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশে মরদেহগুলো ফেরত আনার ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর।
Advertisement
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়েজ উদ্দিন বলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধিরা আসছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য। নিহতদের মরদেহ ফেরত আনার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অবৈধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তারা তো দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছেন। বৈধ কি অবৈধ এই বিষয়টি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে আসা প্রতিনিধিরা দেখবেন। তিনি পরিদর্শনের পর এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা যাবে।
প্রসঙ্গত, দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ৫ জন নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের এবং বাকি একজন মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা।
মোবাশ্বির শ্রাবণ/এফএ