সামছুল আলম শিমুল
Advertisement
১.বর্ষা এলেই তিথিদের বাড়ির পাশের বিলটা টইটুম্বুর হয়ে ওঠে। ঘরের জানালা দিয়ে তাকালে বিলটাকে ছবি আঁকার বিশাল এক ক্যানভাস মনে হয়। সেই ক্যানভাসের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে একটি কদম গাছ। দিনের পর দিন জানালার পাশে বসে সেই ক্যানভাসেই মনের রঙে ছবি আঁকে। কখনো কদম গাছের ডালে কয়েকটি সাদা বক বসিয়ে দেয়, কখনো বিলের বুক চিরে এগিয়ে চলা একটি পালতোলা নৌকা।
গত বর্ষা থেকে এ বর্ষা—পুরো একটা বছর যেন কেটে গেছে এই জানালার পাশেই। এই জানালা থেকেই সে দেখেছে শীতে শুকিয়ে যাওয়া বিলের বুকে সবুজ ধানের দোলা, আবার শরতে দিগন্তজোড়া কাশফুলের শুভ্রতা। প্রকৃতি আগে যে তার ভালো লাগত না, তা নয়। কিন্তু এই এক বছরে সে নিজেকে কদম গাছের মতো কিংবা চৈত্রের শুকিয়ে যাওয়া বিলের মতো ভাবতে শিখেছে—যাদের কাজ শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া।
আজকের দিনটাও হয়তো অন্য দিনের মতোই কাটত। সকালে মা দাঁত ব্রাশ করিয়ে খাইয়ে দিতেন, তারপর সে জানালার পাশে বসে বিলের দিকে তাকিয়ে থাকত। হয়তো মনের ক্যানভাসে কদমগাছের নিচে কদমফুল হাতে অপেক্ষমান এক যুবককে আঁকত, কিংবা কয়েকটি দুষ্টু ছেলেকে, যারা গাছে উঠে সব ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে।
Advertisement
কিন্তু কাল রাতে ছোট বোন সিঁথি এসে জানিয়ে গেল—আজ শুভ্রর বিয়ে। খবরটা শুনে সে অবাক হয়নি। শুভ্রর বিয়ে তো স্বাভাবিকই। ওর বয়স হয়েছে, ভালো চাকরি করে। বিয়ে সে করতেই পারে। এখন আর তো সে তিথির কেউ নয়।
তবু গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘুম ভেঙে যায় তার। জানালার পাশে এসে বসে। হালকা বাতাস এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। চুল চোখে-মুখে এসে পড়তেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়।
একসময় বাতাসে তার চুল উড়ে এলোমেলো হলেই শুভ্র হাসতে হাসতে বলত, ‘তুই তো চুল বিক্রি করেই কোটিপতি হতে পারবি। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার কী দরকার?’
আরও পড়ুন অর্ধলিখিত উপন্যাস২.শুভ্রর সঙ্গে তিথির পরিচয়টাও ছিল মনে রাখার মতো।ঈদের ছুটিতে দুজনই ঢাকা থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরছিল। ভয়াবহ যানজটে বাস প্রায় বারো ঘণ্টা দেরি করেছিল। বিকেল চারটার বাস গন্তব্যে পৌঁছেছিল ভোর চারটায়। মাঝপথেই তিথির ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যায়। বাসায় শুধু এটুকুই জানাতে পেরেছিল—‘চিন্তা করো না। ভালোভাবেই পৌঁছাব, ইনশাআল্লাহ।’
Advertisement
মেয়ের এত দেরি দেখে তিথির বাবা গ্রামের স্ট্যান্ড ছেড়ে শহরের বাসস্ট্যান্ডে খুঁজতে বের হন। ভোর চারটা। অন্ধকার একটু একটু করে ফিকে হচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এখনো থামেনি। কোথাও একটা পাখি করুণ সুরে ডাকছে।
নির্জন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল শুধু দুজন তরুণ-তরুণী। তিথির ভয় করছিল। তখনই শুভ্র এগিয়ে এসে বলল, ‘সামনে যেতে হলে ব্যাগটা দিন, আমি নিয়ে নিই। আর যদি আপনাকে নিতে কেউ আসে, তাহলে তারা না আসা পর্যন্ত আমিও থাকব।’
দ্বিধা থাকলেও ভারী ব্যাগটা শুভ্রর হাতেই তুলে দেয় তিথি। গায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি-শার্ট। বুঝল, ছেলেটিও তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পুরো পথে খুব বেশি কথা হয়নি। শুধু জানতে পেরেছিল, শুভ্র পাশের গ্রামেই থাকে এবং সে তিথিকে আগে থেকেই চিনত।
এরপর আর দেখা হয়নি। তিথির মনে একটা আফসোস থেকেই গিয়েছিল—ছেলেটিকে ঠিকমতো ধন্যবাদও জানানো হয়নি।
তবে সেই সুযোগ খুব তাড়াতাড়িই এসে যায়। ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পথে আবারও একই বাসে ওঠে তারা। এবার সিটও পাশাপাশি। তারপর ধীরে ধীরে দুটি পথ এক হয়ে যায়।
হাত ধরে হেঁটেছে টিএসসি থেকে নীলক্ষেত, কখনো শাহবাগ। টং দোকানের ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে ভাগাভাগি হয়েছে বিকেল। শুভ্র শুনিয়েছে সুনীল আর নির্মলেন্দু গুণের কবিতা, তিথি গেয়েছে রবীন্দ্রসংগীত। নীলক্ষেত থেকে কেউ কারো জন্য কিনেছে প্রেমের পদ্য, ভালোবাসার গদ্য।
দুই পরিবারও আপত্তি করেনি। শুভ্র নতুন চাকরি পেয়েছে, তিথির মাস্টার্সও শেষ। বিয়ের কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত। দুই পরিবার বলেছিল, ‘একসঙ্গেই চলে এসো। সবাই মিলে বসে দিনক্ষণ ঠিক করি।’
তিথির মনে তখন রঙিন স্বপ্ন। পরনে সাদা শাড়ি, কপালে কালো টিপ, কানে লাল পাথরের দুল। বর্ষার বাতাসে খোলা চুল উড়ছিল। শুভ্র মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
বাস ছুটছিল দ্রুত। শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে তিথি ভাবছিল ছোট্ট এক সংসারের কথা—সন্ধ্যার চায়ের আড্ডা, ছোটখাটো খুনসুটি আর নিঃশব্দ ভালোবাসা। ঠিক তখনই—একটি বিকট শব্দ। তারপর শুধু অন্ধকার।
আরও পড়ুন ফারজানা অনন্যার গল্প: বীজ৩.সেদিন সারাটা রাত তিথি একফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি। চোখে এখন আর জল আসে না। গত এক বছরে যত কান্না ছিল, সব যেন শেষ হয়ে গেছে।
শুভ্রকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। শুভ্র এসেছিল। বারবার এসেছিল। মিনতি করে বলেছিল, ‘তুই আগের তিথিই আছিস। আমি কোথাও যাচ্ছি না।’ কিন্তু তিথিই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে জানত, ভালোবাসা মানে শুধু ধরে রাখা নয়; কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে সিঁথিকে ডাকল—‘হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আজ আমাকে একটু বিলের পাড়ে নিয়ে যাবি?’ সিঁথি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই এক বছরে তিথি ঘরের বাইরে কোথাও বের হয়নি। সিঁথি হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে চলল।
হুইলচেয়ারে বসে আছে হাত-পা হারানো এক তরুণী। শরীরের অবশিষ্ট অংশটুকু যেন এক টুকরো মাংসপিণ্ড। অথচ বাতাসে এখনো উড়ছে তার দীর্ঘ, ঘন চুল। সেই চুলে বর্ষার বাতাস আজও আগের মতোই লুকোচুরি খেলে।
বিলের পাড়ে এসে তিথি গভীর করে শ্বাস নিলো। অনেক দিন পর মনে হলো, বুকের ভেতর জমে থাকা বিশাল পাথরটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে।
আজ শুভ্রর নতুন জীবন শুরু হচ্ছে। আর আজই তিথিও বিদায় জানাল তার অসমাপ্ত ভালোবাসাকে। বর্ষার বাতাস আলতো করে তার চুল এলোমেলো করে দিলো। বাতাসের সঙ্গে সেও শেষবারের মতো বিদায় জানিয়ে দিলো তার সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত ভালোবাসা।
এসইউ