জাতীয়

‘গ্যাস নিতেই সারাদিন পার, ইনকাম নাই বললেই চলে’

‘ভাড়ায় গাড়ি চালাই। দিনে দুই ট্যাংকিতে এক হাজার টাকার গ্যাস লাগে। আগে সহজেই গ্যাস পাইতাম, মালিকের জমা দিয়েও ভালো আয় হতো। কিন্তু এখন এই এক হাজার টাকার গ্যাস নিতেই লাইনে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গ্যাস নিতেই যদি সারাদিন পার হয়ে যায়, তবে আয় করবো কখন? ইনকাম বলতে এখন আর কিছুই নেই।’

Advertisement

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে মগবাজারের সিএনজি পাম্প থেকে গ্যাস সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছিলেন উবারচালক আলম। ২০২০ সালের করোনাকাল থেকে তিনি ভাড়ায় গাড়ি চালান। তার মতে, গ্যাসের এমন ভয়াবহ সংকট তিনি আগে কখনো দেখেননি।

আলমের মতো একই দুর্ভোগের কথা জানালেন আরেক উবারচালক মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাস না পেয়ে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে দৌড়াদৌড়ি করছি। ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারছি না, ফলে মালিকের জমার টাকা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাস শেষে বাড়িভাড়া ও সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালানো এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর সহ্য হয় না।’

বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাসের তীব্র সংকটে রাজধানী ঢাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা চরম দিশাহারা। পাম্পগুলোতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

Advertisement

আরও পড়ুন তিতাস এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটের ফের সতর্কতা

কামরুল হাসান নামের এক উবারচালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া তো দূরে থাক, গাড়ি রেখে বাথরুমে যাওয়ার সুযোগটুকুও পাচ্ছেন না চালকরা।

মগবাজারের এক পাম্পে দাঁড়িয়ে অটোরিকশাচালক নুরুল হক আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমরা কি মানুষ নই?’

আরেক উবারচালক আসাদুজ্জামান জানান, কয়েকদিন আগে ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র ২৯৭ টাকার গ্যাস পেয়েছেন, যেখানে আগে একবারে ৬০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যেত। এই সামান্য গ্যাসে দু-তিনটি ট্রিপ মেরেই আবার শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে চড়া দামে পেট্রল দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

সিএনজিচালক তিতু মিয়ার মতে, ‘গ্যাসের দাম বাড়িয়ে হলেও যদি সরবরাহের সমাধান হতো, তাহলেও আমরা এই ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতাম।’

Advertisement

আরও পড়ুন গ্যাস সংকটে স্থবির আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল, শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা

গ্যাস সংকটের প্রভাব কেবল সড়কে সীমাবদ্ধ নেই, মারাত্মকভাবে পড়েছে বাসাবাড়িতেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বনশ্রী, ফার্মগেট, ইস্কাটন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, কাঁটাবন, আজিমপুর, উত্তরা ও পুরান ঢাকার লালবাগসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় তিতাসের গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই বা নামমাত্র।

আজিমপুরের গৃহিণী সায়েরা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতি মাসে তিতাসের বিল ঠিকই দিচ্ছি, কিন্তু চুলায় গ্যাস মিলছে না।’

বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস বা ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেটে অতিরিক্ত টান পড়ছে।

আরও পড়ুন গ্যাস সংকটসহ শিল্প খাতের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

লালবাগ এলাকার বাসিন্দা রিফাত হোসেন জানান, সরকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে সংকটের দোহাই দিয়ে তা ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। রসিদ চাইলে বিক্রেতারা সরাসরি গ্যাস নেই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

একদিকে সিলিন্ডার কেনার খরচ, অন্যদিকে ইন্ডাকশন চুলার কারণে বিদ্যুৎ বিলের ভারী বোঝা।

হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, অন্যান্য মাসের তুলনায় গত মাসের বিল অনেক বেশি এসেছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা বিল এলেও সর্বশেষ বিল সাড়ে ৫ হাজার টাকা এসেছে। বেশি ব্যবহারের মধ্যে রান্নার জন্য শুধু ইন্ডাকশন চুলায় রান্না করেছেন বলে জানান।

আরও পড়ুন বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন, বাসায়ও জ্বলছে না চুলা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক 'এক্সিলারেট এনার্জি' পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে একটি জাহাজ ভিড়তে গিয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এরপর কারিগরি ত্রুটির কারণে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত রাজধানীবাসীকে এই চরম ভোগান্তি সহ্য করতে হবে।

এমইউ/বিএ