তার টেস্ট ক্যারিয়ার আহামরি নয়। ৬১ টেস্টে ৬ সেঞ্চুরি আর ৮ হাফসেঞ্চুরিসহ রান মোটে ২৭৩৭। ওই দীর্ঘ টেস্ট ক্যারিয়ারে মোহাম্মদ আশরাফুল মাত্র ২ টেস্টে উভয় ইনিংসে ‘শূন্য’ রানে আউট হয়েছেন। তার একটি ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে, কেয়ার্নসে দ্বিতীয় টেস্টে।
Advertisement
বলে রাখা ভালো, আজ থেকে ২৩ বছর আগে বাংলাদেশ যে বার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম ও শেষবারের মতো ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল, সেই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের উভয় ইনিংসে ‘জিরো’ রানে আউট হয়েছিলেন আজকের টাইগারদের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল।
একজন ব্যাটার এক টেস্টে একবার কেন, দুইবার বা উভয় ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হতেই পারেন। সেটা টেস্ট ক্রিকেটের স্বাভাবিক চিত্র বলেই পরিগণিত। কিন্তু মোহাম্মদ আশরাফুলের ওই কেয়ার্নস টেস্টে উভয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়ার ঘটনাটি এক বিশেষ কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে।
কি সেই স্মরণীয় স্মৃতি?
Advertisement
আজ ৩০ জুলাই জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে সেই স্মরণীয় স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছিলেন আশরাফুল। বলে রাখা ভালো, আগামীকাল শুক্রবার মধ্যরাতে অস্ট্রেলিয়া যাবে বাংলাদেশ দল।
২৩ বছর আগে ব্যাটার হিসেবে অসিদের বিপক্ষে ডারউইন ও কেয়ার্নসে ২ টেস্ট খেলা মোহাম্মদ আশরাফুল এবার টিম বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ।
সেই ২০০৩ সালের ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আশরাফুল এক দারুণ গল্প শুনিয়েছেন। ঘটনাটি আশরাফুল আর অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট ও ওই সিরিজে টিম অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহকে নিয়ে।
ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেটপাগল আশরাফুল খুব ছোটবেলা থেকেই নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিং আর অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহকে অনুসরণ করতেন।
Advertisement
তাই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট সিরিজে আশরাফুলের একটা লক্ষ্যই ছিল অসি অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলা। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমি খুব করে চেয়েছি স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে কথা বলতে। তার অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে। বলে রাখা ভালো, সেটা শুধুই যে একজন ক্রিকেট গ্রেটের সঙ্গে ভাববিনিময় তা নয়। তার কাছ থেকে নানা ধরনের গল্প শুনলে আমার নিজের ক্যারিয়ারেও সাহায্য হবে, সে চিন্তাটাও ছিল।’
‘ডারউইনে প্রথম টেস্ট শেষে অসি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ খেলা শেষে আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, তোমরা সবাই (পুরো বাংলাদেশ দল) এসো আমাদের ড্রেসিংরুমে। আমরা দুই দল মিলে গল্প করব।’
‘তার কথা মতো আমরা কিছুক্ষণ পর যাই অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে। গিয়ে দেখি স্টিভ ওয়াহ প্রেস মিটে কথা বলছেন। আমরা ১০ মিনিট থেকে চলে আসি। টু বি অনেস্ট, আমরাও তো আর ইংরেজিতে অতটা কমফোর্টেবল ছিলাম না। তাই কিছুক্ষণ পর চলে আসি। স্টিভ ওয়াহ প্রেস কনফারেন্স শেষে দেখেন যে আমরা আমাদের ড্রেসিংরুমে, আর অস্ট্রেলিয়ানরা তাদের ড্রেসিংরুমে ।’
আশরাফুল সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আরও বলেন, ‘পরে স্টিভ ওয়াহ বলেন, দাঁড়াও, আমরাই আসছি তোমাদের ড্রেসিংরুমে। পরে ওদের রুমে আমরা আবার গেলাম। অনেক গল্প-টল্প করলাম। এর মধ্যে আমার চোখ গেল স্টিভ ওয়াহর ব্যাটিং গ্লাভসের দিকে। আমি দেখলাম দুধসাদা ধবধবে গ্লাভস। অন্য কোনো রঙের বর্ডার বা কাজ ছিল না। এমন ধবধবে সাদা গ্লাভস দেখে খুব পছন্দ হলো। আমি লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম, তোমার গ্লাভসটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
স্টিভ ওয়াহ আমাকে বললেন, ঠিক আছে, আমি তোমাকে ঠিক এমন একজোড়া দুধসাদা ব্যাটিং গ্লাভস উপহার দেব। তবে একটা শর্তে।’
কি সেই শর্ত?
‘তিনি আমাকে বললেন, কেয়ার্নসে পরের টেস্টে যদি তুমি পঞ্চাশ করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে একই রকম এমন সাদা গ্লাভস উপহার দেব। স্টিভ ওয়াহর ওই কথা শুনে আমি পুলকিত হলাম। একটা অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগল ভেতরে। স্টিভ ওয়াহর কাছ থেকে ব্যাটিং গ্লাভস পাব, এই চিন্তা এসে বাসা বাঁধল মাথায় ‘
‘সেই গ্লাভস পাওয়ার চিন্তাটা যে আমার ভেতরে একটা অন্যরকম টেনশন তৈরি করবে, শুরুতে তা ভাবিনি; কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, সেই হাফসেঞ্চুরির চিন্তা আমাকে পেয়ে বসল। আমি ওই অর্ধশতকের চিন্তায় নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংই যেন ভুলে গেলাম।’
‘শেষ টেস্টে আর পঞ্চাশ করতে পারলাম না। হাফসেঞ্চুরি হাঁকানো বহুদূরের কথা, আমি দ্বিতীয় টেস্টে উভয় ইনিংসে জিরো রানে আউট হলাম। যে কারণে আর আমার স্টিভ ওয়াহর কাছ থেকে ব্যাটিং গ্লাভস পাওয়া হলো না।’
‘আমার পুরো টেস্ট ক্যারিয়ারে এক টেস্টের উভয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়ার ঘটনা দুটি। যার প্রথমবার ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই টেস্টে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে আউট হওয়ার ঘটনাটিও ভোলার মতো নয়। বোলার ছিলেন স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল।’
‘অস্ট্রেলিয়ান লেগস্পিনার ম্যাকগিলের বলে আমি দ্বিতীয় ইনিংসে ডাউন দ্য লেগে আউট হই। লেগস্ট্যাম্পের বাইরের ডেলিভারি আমার গ্লাভসে লেগে লেগসাইড দিয়ে চলে যায় উইকেটের পেছনে। ফিল্ডার ও কিপার মিলে আবেদন করেন; কিন্তু আম্পায়ার রুডি কোয়ের্টজেনও নীরব। আউট দেননি।’
‘আমি নিশ্চিত আউট ভেবে উইকেট ছেড়ে সাজঘরের পথে কয়েক পা এগিয়েও যাই। পরে যখন দেখলাম আম্পায়ার চুপ, তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উইকেটের নরম মাটি ব্যাট দিয়ে দাবিয়ে দিচ্ছিলাম। অবশেষে আম্পায়ার আঙুল তুললে আমি বেরিয়ে যাই। ঘটনাটি মনে হলে এখনো একটু অন্যরকম লাগে।’
‘গ্লাভসের চাপে দুই ইনিংসে জিরো মারার সেই স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াই। স্টিভ ওয়াহ যদিও তার বইয়ে লিখেছেন যে তিনি আমাকে সেই গ্লাভস উপহার দিয়েছেন; কিন্তু বাস্তবে আমাকে গ্লাভস দেননি। মানে, আমার আর স্টিভ ওয়াহর কাছ থেকে ব্যাটিং গ্লাভস পাওয়া হয়নি।’
আইএইচএস/আইএইচএস/