বিনোদন

যিনি বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের সিনেমা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ববিতা একটি কিংবদন্তিতুল্য নাম। অভিনয়ের মুগ্ধতা, অনন্য ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের মাধ্যমে তিনি শুধু দেশের দর্শকের হৃদয় জয় করেননি, বিশ্বমঞ্চেও উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের সিনেমাকে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তার অভিনয়জীবন সমৃদ্ধ করেছে দেশের চলচ্চিত্রকে। আজ (৩০ জুলাই) এই বরেণ্য অভিনেত্রীর জন্মদিন।

Advertisement

১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ববিতা। তার প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার পপি। সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠা ববিতার শিল্পীজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। তার বড় বোন সুচন্দা এবং ছোট বোন চম্পা-দুজনই দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। পারিবারিক পরিবেশই তাকে অভিনয়ের জগতে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে শোবিজে পথচলা শুরু হলেও বড়পর্দায় তার প্রথম কাজ ছিল জহির রায়হান পরিচালিত ‘সংসার’ সিনেমায়। যদিও সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। এরপর আব্দুল্লাহ আল মামুনের টেলিভিশন নাটক ‘কলম’-এ অভিনয় করে প্রশংসিত হন। পরে জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমায় কাজের সময় প্রযোজক আফজাল চৌধুরী ও তার স্ত্রীর পরামর্শে ‘ফরিদা আক্তার পপি’ থেকে ‘ববিতা’ নামেই পরিচিতি পান তিনি।

১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নায়িকা হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন ববিতা। সে সময় এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ১২ হাজার টাকা। সেই ছবির সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে দেশের শীর্ষ অভিনেত্রীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

Advertisement

আরও পড়ুন মঞ্চে আবেগে ভেসে কাকে ‘আই লাভ ইউ মা’ বলে কাঁদলেন পরীমনি

দেশীয় চলচ্চিত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের অভিনয়গুণের স্বাক্ষর রেখেছেন ববিতা। ভারতীয় কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ান তিনি। সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং ববিতার অভিনয়ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। এর মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার একটি শক্তিশালী পরিচয় তুলে ধরেন তিনি।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ববিতা অর্জন করেছেন অসংখ্য সম্মাননা। স্বাধীনতার পর ‘বাদী থেকে বেগম’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এরপর ‘নয়নমণি’, ‘বসুন্ধরা’, ‘রামের সুমতি’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, ‘হাসন রাজা’ এবং ‘কে আপন কে পর’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৬ সালে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা।

আরও পড়ুন বিশেষ চমক বাঁধন / ভারতের নায়িকার পর যোগ দিলেন ওমর সানী, আমিন খান, রোজিনা

জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন ববিতা। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে একসময় ‘পুরস্কার কন্যা’ বলেও অভিহিত করা হতো। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়া শিল্পীদের একজনও তিনি।

চলতি বছর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন ববিতা। এছাড়া এপ্রিলে রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে তাকে ‘হুজ হু’ সম্মাননাও দেওয়া হয়। এসব অর্জন তার দীর্ঘ ও গৌরবময় অভিনয়জীবনেরই স্বীকৃতি।

Advertisement

ববিতা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ববিতার অবদান শুধু একজন সফল অভিনেত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের সিনেমাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিত করেছেন, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্রের ধারা, এসেছে নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তারকা। কিন্তু অভিনয়ের গুণ, ব্যক্তিত্ব এবং সৃষ্টিশীল অবদানের কারণে ববিতা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার নাম উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের সিনেমার গর্ব এবং বিশ্বদরবারে দেশের চলচ্চিত্রকে তুলে ধরা একজন সফল শিল্পী হিসেবেই।

এমএমএফ