আমাদের মস্তিষ্কে থাকা রক্তনালীগুলোকে ঘিরে রাখে ‘ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার’ বা ‘রক্তের সুরক্ষা প্রাচীর’, যা বিষাক্ত পদার্থ ও জীবাণুকে আটকে রেখে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। এটি মস্তিষ্কের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা একটি জনপ্রিয় কৃত্রিম চিনি বা মিষ্টি এই জরুরি সুরক্ষাবলয়ের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
Advertisement
‘ইরিথ্রিটল’ (Erythritol) নামক এই মিষ্টি জাতীয় উপাদান কয়েক দশক ধরে কৃত্রিম চিনি বা মিষ্টি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। খাদ্য প্রস্তুতকারক ও ক্রেতাদের কাছে এটি ভীষণ জনপ্রিয়, কারণ এটি ক্যালোরিহীন, সাধারণ চিনির চেয়ে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি মিষ্টি ও এটি রক্তে ইনসুলিনের মাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলে না।
তবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ফিজিওলজি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় এই চিনি রক্তের সুরক্ষা প্রাচীরের কোষের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের একদল গবেষক এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
অতীতে একাধিক গবেষণায় রক্তে ইরিথ্রিটলের উচ্চমাত্রার সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের বাড়তি ঝুঁকির যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকদের নতুন এ আবিষ্কার ব্যাখ্যা করতে পারে যে, শরীরের ভেতরে বাস্তব পরিস্থিতিতেও যদি একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটে, তবে এটি কীভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
Advertisement
প্রকাশিত গবেষণাপত্রে গবেষকরা উল্লেখ করেন, এখানে উপস্থাপিত ফলাফলগুলো ইরিথ্রিটল ও স্ট্রোকের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরা পূর্বের মহামারি সংক্রান্ত গবেষণাগুলোকে সমর্থন করে ও মানদণ্ড বাড়ায়। ফলে ইরিথ্রিটল গ্রহণের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য প্রভাব নিয়ে আরও ক্লিনিকাল গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা যায়, এন্ডোথেলিয়াল কোষে ইরিথ্রিটল যোগ করার ফলে কোষগুলোতে নাইট্রিক অক্সাইডের উৎপাদন কমে যায়। উল্লেখ্য, এই নাইট্রিক অক্সাইডই মূলত রক্তনালীকে প্রসারিত ও শিথিল রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি 'এন্ডোথেলিন-১' নামক এক ধরনের প্রোটিন বেশি তৈরি করে, যা রক্তনালীকে সংকুচিত করে তোলে—অর্থাৎ রক্তনালী সচল রাখার ক্ষেত্রে এটি এক জোড়া নেতিবাচক আঘাত হিসেবে কাজ করে।
শুধু তা-ই নয়, রক্ত জমাট বাঁধা দূর করার ক্ষেত্রে জরুরি উপাদান 'টিস্যু প্লাসমিনোজেন অ্যাক্টিভেটর' (t-PA)-এর নিঃসরণ এই কৃত্রিম চিনির কারণে কমে যায়। পাশাপাশি সেখানে ফ্রি-র্যাডিকেল বা রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিজ অণুর মতো ক্ষতিকর উপজাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা টিস্যুর ক্ষতি করতে সক্ষম।
এসব ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে রক্তে ইরিথ্রিটলের মাত্রা বেড়ে গেলে রক্ত জমাট বেঁধে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। রসায়নটি এন্ডোথেলিয়াল কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে মস্তিষ্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
Advertisement
এ বিষয়ে গবেষক ও শারীরবিজ্ঞানী অবোর্ন বেরি বলেন, সহজ কথায় বলতে গেলে, আপনার রক্তনালী যদি সংকুচিত হয়ে যায় ও জমাট বাঁধা রক্ত গলানোর ক্ষমতা কমে যায়, তবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আমাদের গবেষণা কেবল এটি প্রমাণই করে না, বরং ইরিথ্রিটল কীভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় সেই প্রক্রিয়াটিও স্পষ্ট করে।
গবেষকরা আপাতত ল্যাবে শুধুমাত্র মস্তিষ্কের এন্ডোথেলিয়াল কোষের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন ও তাদের প্রাপ্ত তথ্য ‘ইসকেমিক স্ট্রোক’-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে খুঁজে পেয়েছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরিথ্রিটল মস্তিষ্কের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অংশের রক্তনালীর এন্ডোথেলিয়াল কোষকেও প্রভাবিত করতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে সে বিষয়টি এই গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল না।
অন্যান্য গবেষণায় বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এন্ডোথেলিয়াল কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মস্তিষ্ককে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি করতে পারে, যদিও এই গবেষণায় সে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়নি। তবে গবেষকরা যে ফল পেয়েছেন, তা ইরিথ্রিটল খাওয়া কমানোর গুরুতর পরামর্শ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
আরেকজন শারীরবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ডি-সুজা বলেন, যে মহামারিসংক্রান্ত গবেষণা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল ও বর্তমানের এই সেলুলার গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষের উচিত হবে এই ধরনের পুষ্টিহীন চিনি গ্রহণের মাত্রা কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তবে এই গবেষণার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা সতর্কবার্তা হলো- এটি ল্যাবরেটরিতে কোষের ওপর চালানো পরীক্ষা, জীবিত কোনো মানুষের ওপর চালানো গবেষণা নয়। ফলে ল্যাবে ব্যবহৃত ইরিথ্রিটলের ডোজ বা কার্যপদ্ধতি বাস্তব জীবনের পরিস্থিতি বা মাত্রার সঙ্গে পুরোপুরি নাও মিলতে পারে।
এছাড়া মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেও কিছুটা ইরিথ্রিটল তৈরি হয়। রক্তে এর উচ্চমাত্রা শুধুই খাবার বা পানীয় গ্রহণের কারণে নয়, বরং শরীরের অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যার সংকেতও হতে পারে। এমনকি, কিছু কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে, ইরিথ্রিটল রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, ক্ষতি নয়।
এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হতে আরও বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ইরিথ্রিটল যেহেতু ‘সুগার অ্যালকোহল’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ থাকার কারণে কৃত্রিম চিনি সংক্রান্ত সতর্কবার্তা থেকে এ যাবৎ বাদ পড়ে আসছিল, তাই এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আরও গভীরভাবে তদন্ত করা আবশ্যক।
ডি-সুজা আরও যোগ করেন, আমাদের এ গবেষণা নতুন প্রমাণ যোগ করেছে যে, যেসব অ-পুষ্টিকর মিষ্টিকে এতদিন সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা হচ্ছিল, সেগুলো স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত নাও হতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ফিজিওলজি
এসএএইচ