দেশের সব গণপরিবহনে আগামী ১ আগস্ট থেকে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ডিভাইস সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
Advertisement
সংশ্লিষ্টদের মতে এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে যাত্রী নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাস মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সুফল পেতে পারেন।
২৮ জুলাই বিআরটিএর জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ প্রদান বা নবায়নের সময় জিপিএস সংযুক্তির প্রমাণপত্র এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল অ্যাপে ডিভাইস সচল থাকার তথ্য দেখাতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী জিপিএস সংযুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পরই রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ প্রদান বা নবায়ন করা হবে।
আরও পড়ুন ১ আগস্ট থেকে সব গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক: বিআরটিএশুধু জিপিএস ডিভাইস স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী ডিভাইসটি সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে। অর্থাৎ কেবল যন্ত্র বসানো নয়, সেটি কার্যকর রয়েছে কি না, তাও নিয়মিত তদারকির আওতায় থাকবে।
Advertisement
বিশ্বের অনেক দেশেই গণপরিবহনে জিপিএস প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও কলকাতার সরকারি বাসে জিপিএসের মাধ্যমে গাড়ির অবস্থান, গতি ও রুট পর্যবেক্ষণ করা হয়। সিঙ্গাপুরে যাত্রীরা মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল ডিসপ্লেতে বাসের অবস্থান ও সম্ভাব্য গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় জানতে পারেন।
আরও পড়ুন অনিয়ম রোধে সব গণপরিবহনে বসবে জিপিএস ট্র্যাকার: সড়কমন্ত্রীযুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়ও জিপিএসভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বহর পরিচালনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া হয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, জিপিএস শুধু যানবাহনের অবস্থান জানার প্রযুক্তি নয়; এটি নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠ সেবা এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর হাতিয়ার।
যাত্রীদের যেসব সুবিধা হতে পারেপ্রতিটি বাসের অবস্থান রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। দুর্ঘটনা, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা নারী ও শিশু হয়রানির মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থল শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হতে পারে।
দুর্ঘটনার তদন্ত সহজ হতে পারেকোনো বাস কখন কোথায় ছিল, কত গতিতে চলছিল এবং কোন রুট অনুসরণ করছিল—এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকলে দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো ঘটনার তদন্তে জিপিএসের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
Advertisement
গাড়ির গতি ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় অতিরিক্ত গতিতে চালানো এবং অনুমোদিত রুট পরিবর্তনের প্রবণতা কমতে পারে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যাত্রী ভোগান্তি কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।
বাসের অবস্থান জানার সুযোগ তৈরি হতে পারেভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা ও যাত্রীবান্ধব মোবাইল অ্যাপ চালু হলে যাত্রীরা বাসের অবস্থান এবং সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময় জানতে পারবেন। এতে অপেক্ষার সময় কমতে পারে।
সেবার মান ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারেবাস কোথায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে থেমেছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করেছে কি না—এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকায় অভিযোগ তদন্ত ও সেবা তদারকি সহজ হতে পারে।
বাস মালিকদের যেসব সুবিধা হতে পারেজিপিএসের মাধ্যমে মালিকরা তাদের গাড়ির অবস্থান, রুট, গতি ও চলাচলের সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এতে বহর ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে, জ্বালানি অপচয় কমানো এবং রুটের বাইরে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে। বাস চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করাও সহজ হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের অভিযোগ বা দুর্ঘটনার ঘটনায় সংরক্ষিত তথ্য দেখে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?এ ছাড়া জিপিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন রুটে যাত্রীর চাপ বেশি, কোথায় বাসের সংকট বা অতিরিক্ত যান চলাচল রয়েছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে পরিবহন পরিকল্পনা, রুট পুনর্বিন্যাস এবং যানজট ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।
পরিবহন শ্রমিকদেরও মিলতে পারে সুবিধাচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে জিপিএসের তথ্যের মাধ্যমে তা যাচাই করা সহজ হতে পারে। দুর্ঘটনা, ডাকাতি, হামলা বা যান্ত্রিক ত্রুটির মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজের অবস্থান জানিয়ে সহায়তা চাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। একই সঙ্গে কোনো বাস অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলে জিপিএসের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তেও সহায়ক হতে পারে।
কার্যকর বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জিপিএস ডিভাইস স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। ডিভাইস সার্বক্ষণিক সচল রাখা, কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে রিয়েল-টাইম বাস ট্র্যাকিং, স্মার্ট ফ্লিট ব্যবস্থাপনা, যাত্রী তথ্যসেবা এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবার সঙ্গে এই প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা আরও নিরাপদ, আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।
এমইউ/এমএমকে