চারদিকে সাদা দেওয়ালের বেষ্টনী। শান্ত-স্নিগ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ। চারপাশে তেমন কোনো কোলাহল নেই। সাদা রঙের ভবনের উত্তর পাশে বারান্দা। সামনের চত্বরে সবুজ ঘাস, দেওয়াল ঘেঁষে কাঁঠাল গাছ। একটু পরপর কয়েকটি নারকেল গাছও রয়েছে। উত্তরার বিমানবন্দর এলাকার র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতল টিনশেড ভবনটিকে দেখে প্রথমে আলাদা কিছু মনে হয় না।
Advertisement
ভবনের পাশেই অস্ত্রাগার। উত্তর-পশ্চিম পাশে বড় একটি লোহার খাঁচা। সেখানে ডগ স্কোয়াড থাকত বলে জানানো হয়েছে। আশপাশে হালকা এক ধরনের উদ্ভট গন্ধও পাওয়া যায়। সামনে গেটের পাশে রয়েছে নিরাপত্তাকর্মীদের বসার স্থান। বাইরে থেকে ভবনটির ভেতরে কী ছিল, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। সামনের দিক থেকে দেখলে এটিকে একটি সাধারণ অফিস বলেই মনে হবে।
কিন্তু গেট পেরিয়ে ভবনের পেছনের দিকে গেলেই চোখে পড়ে দেড়তলা সমান একটি সিঁড়ি। সিঁড়ির গোড়ার ডান পাশে রয়েছে প্রায় দেড় ফুট প্রস্থ ও চার ফুট দৈর্ঘ্যের একটি দরজা।
পরিদর্শনকারীদের একজনের মতে, কক্ষগুলোর আকার ও নির্মাণশৈলী সাধারণ কারাগারের সেলের সঙ্গে মেলানো কঠিন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ এসব কক্ষকে ‘মুরগির খোয়ার’ বলেও বর্ণনা করেন।
Advertisement
দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্য বদলে যায়। গরম ও ভারী বাতাস। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই শরীর ঘামে ভিজে যায়। কোথাও জানালা নেই। কোথাও এমন সংকীর্ণ কক্ষ, যেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোই সম্ভব নয়। কোনো কোনো জায়গায় বসলে উঠে দাঁড়ানোও কঠিন। আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগও সামান্য।
পেছনে ঢোকার সময় সিঁড়ির ডান পাশে এই দরজা দিয়ে আয়না ঘরে ঢোকার রাস্তা: ছবি জাগো নিউজ
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আবার ডান দিকে ঘুরে নিচে নামতে হয়। বাইরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ, আর ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে ঢোকার পর নিজের শরীরও দেখা যায় না। আছে নানান ধরনের সেল। একেই বলা হচ্ছে গোপন বন্দিশালা তথা আয়নাঘর।
আরও পড়ুন গুমের শিকার বন্দিদের বলা হতো ‘মোনালিসা’, গুমঘরকে ‘আর্ট গ্যালারি'শনিবার (১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারক, প্রসিকিউশন দল এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যখন এই ভবনে প্রবেশ করেন, তখন তারা এমনই একটি স্থাপনার মুখোমুখি হন। গুমের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই পরিদর্শন করা হয়।
Advertisement
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ভবনটি ঘুরে দেখেন।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে কয়েকটি কক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের শুরুতে ঘটনাস্থলের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার পুরোপুরি মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে কিছু নতুন দেওয়াল অপসারণের পর আড়ালে থাকা কয়েকটি কক্ষের সন্ধান মেলে।
তাদের সঙ্গে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদার, শেখ মইনুল করিম ও তাসমিরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা।
ভাঙা দেওয়ালের ভেতরে দেখলে গা শিউরে ওঠে: ছবি জাগো নিউজ
এছাড়া গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন ও আমির হোসেনও পরিদর্শনে অংশ নেন।
ভবনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ছোট ছোট কক্ষগুলো। একটির উচ্চতা মাত্র ৪১ ইঞ্চি, আরেকটির ৫৩ ইঞ্চি। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যও এই উচ্চতা যথেষ্ট নয়। শোয়ার ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শোয়ার সুযোগ নেই।
পরিদর্শনকারীদের একজনের মতে, কক্ষগুলোর আকার ও নির্মাণশৈলী সাধারণ কারাগারের সেলের সঙ্গে মেলানো কঠিন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ এসব কক্ষকে ‘মুরগির খোয়ার’ বলেও বর্ণনা করেন।
আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ শুধু সাধারণ আইন লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগেরও অংশ। এ বিষয়গুলো সেই আলোকে তদন্ত করা হচ্ছে।
কক্ষগুলোর ভেতরে প্রস্রাব-পায়খানার জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে। জানালা নেই। দিনের বেলায়ও ভেতরে অন্ধকার।
এসব কক্ষে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর মানুষকে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
কেউ পাশের কক্ষে কে আছেন, তা জানতেন না। ভেতরে কী ঘটছে, সেটিও জানার উপায় ছিল না। কক্ষগুলোর এমন নির্মাণ যেন বিচ্ছিন্নতাকে নিশ্চিত করার জন্যই করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন গুমের অভিযোগ সাবেক সেনা কর্মকর্তার / আয়নাঘর ছিল শেখ হাসিনার ভয়ংকর হাতিয়ারভবনের কিছু অংশ এখন আগের মতো নেই। কয়েকটি দেওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে কোনো কোনো জায়গা এখন তুলনামূলক বড় মনে হয়। তবে পরিদর্শনকারীদের জানানো হয়েছে, এসব জায়গার ভেতরে আগে ছোট ছোট কক্ষ ও পার্টিশন ছিল।
একটি বড় জায়গার মধ্যে আগে ছয়-সাতটি ছোট কক্ষ ছিল বলেও জানানো হয়। এসব কক্ষে একজন মানুষ হয়তো দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে শোয়ার সুযোগ ছিল না। হাঁটু ভাঁজ করে শুয়ে থাকতে হতো।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেওয়াল নির্মাণ করে পুরোনো কাঠামো আড়াল করার আলামতও দেখা যায়।
নানা সেল আছে ভেতরে: ছবি জাগো নিউজ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভবনের দেওয়াল, দরজা, জানালা ও অন্যান্য কাঠামো পরিবর্তন বা ধ্বংসের মাধ্যমে গুমের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট কিংবা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। কে বা কারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তা তদন্ত করা হচ্ছে বলেও প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে।
ডেথ সেল, যম সেল ও সাংকেতিক হাসপাতালদ্বিতল ভবনটিতে ২৯টি স্থায়ী সেল রয়েছে। নিচতলার একটি অংশে রয়েছে ১০টি সেল। খোলা টয়লেটসহ প্রতিটি কক্ষের গড় আকার প্রায় ৫ ফুট বাই ৮ ফুট।
নিচতলার অন্য অংশে সৈনিক ব্যারাকের মতো একটি জায়গা রয়েছে। সেখানে টিএফআই সেলের পাহারার দায়িত্বে থাকা র্যাব সদস্যরা অবস্থান করতেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কখনো বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী, আবার কখনো জঙ্গি সন্দেহে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সেখানে আটক রাখা হতো। তাদের মধ্যে কেউ আদালতে হাজির হয়েছেন, কেউ আর ফিরে আসেননি, আবার কেউ ফিরে এসে সেখানে আটক থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে ভবনের কক্ষ, দেওয়াল ও অন্যান্য কাঠামো।
দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আরও ১০টি সেল। এগুলোর গড় আকার প্রায় ১৪ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট। এছাড়া দুটি বড় কক্ষ রয়েছে। এগুলোকে তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’ বলা হতো। এর মধ্যে একটি প্রায় ১৪ ফুট বাই ১০ ফুট এবং অন্যটি ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। সঙ্গে রয়েছে দুটি ছোট টয়লেট।
আরও পড়ুন এএফপিকে সাক্ষাৎকার / আয়নাঘরে যেমন ছিলেন গুম হওয়া ব্যারিস্টার আরমানতথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় তলায়ই টিএফআই সেল এবং র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিসকক্ষ ছিল।
প্রবেশমুখের সিঁড়ির কাছে রয়েছে আরও সাতটি অতিসংকীর্ণ সেল। খোলা টয়লেটসহ এসব কক্ষের গড় আকার আনুমানিক ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এগুলো ডেথ সেল বা যম সেল বলা হতো বলে জানানো হয়েছে।
গুমের অভিযোগে আটক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে গেলে দ্বিতীয় তলার খোলা জায়গা ও করিডোরে ক্যানভাস বা কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো।
প্রসিকিউশন সূত্রের ধারণা অনেক আলামত ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে: ছবি জাগো নিউজ
জানা যায়, টিএফআই সেল হিসেবে পরিচিত এই ভবনটি মূলত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি স্থাপনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
আরও জানা যায়, স্থাপনাটি র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। র্যাবের সাধারণ সদস্যদের অনেকেরই ভবনটির ভেতরে প্রবেশ কিংবা সেখানে কী ঘটত, তা জানার সুযোগ ছিল না। গোপনীয়তা বজায় রাখতে স্থাপনাটিকে সাংকেতিকভাবে হাসপাতাল নামেও ডাকা হতো।
বাইরে গাছের ছায়া। বাতাসে পাতার শব্দ। দূরে র্যাব কম্পাউন্ডের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। আর ভেতরে সেই ছোট ছোট কক্ষ। ৪১ ইঞ্চি উচ্চতার একটি সেল। ৫৩ ইঞ্চি উচ্চতার আরেকটি কক্ষ। এমন কিছু জায়গাও রয়েছে, যেখানে এখন আর কোনো দেওয়াল নেই। তবে পরিদর্শনকারীদের জানানো হয়েছে, একসময় সেখানে আরও ছোট ছোট কক্ষ ছিল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বলপূর্বক গুমের একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে র্যাব কখনো এককভাবে, কখনো অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে টার্গেটভিত্তিক অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও গুমের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। টিএফআই সেলে আটক ব্যক্তিদের অনেক সময় অন্য গোপন বন্দিশালায়ও পাঠানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন র্যাবে আয়নাঘর ছিল, গুম-খুনসহ সব অভিযোগের বিচার হবে: ডিজিতবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, ভবনটিকে আয়নাঘর বলা হচ্ছে, কিন্তু এসব অভিযোগ আদালতে প্রসিকিউশনকে প্রমাণ করতে হবে।
সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, সাবজেক্ট ও বৈদ্যুতিক চেয়ারজানা গেছে, ভবনের ওপরের অংশে ছিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি কক্ষ। এর মধ্যে তিনটি কক্ষ ছিল সাউন্ডপ্রুফ (শব্দনিরোধী)। অভিযোগ রয়েছে, এসব কক্ষের দেওয়ালে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে ভেতরে কী ঘটছে, তা বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সেখানে যাদের নেওয়া হতো, তাদের সাবজেক্ট নামে ডাকা হতো। এসব কক্ষে নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সেখানে একটি ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের সেই চেয়ারে বসিয়ে বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে দ্রুত ঘোরানো হতো। বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। ছাদ থেকে বন্দিদের ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থাও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছিল লোহার বেডসেখানে মইয়ের মতো একটি লোহার বেডও ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বন্দিদের ওই বেডে বেঁধে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হতো। কখনো ধীরগতিতে ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো।
কক্ষগুলোর দেওয়ালে নির্যাতনের শিকার মানুষের বীভৎস ছবি, কাটা হাত এবং চোখ উপড়ে ফেলা মানুষের ছবিও টাঙানো থাকত।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে কয়েকটি কক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের শুরুতে ঘটনাস্থলের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার পুরোপুরি মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে কিছু নতুন দেওয়াল অপসারণের পর আড়ালে থাকা কয়েকটি কক্ষের সন্ধান মেলে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীও রয়েছেন।
আরও পড়ুন গোপন বন্দিশালা ও আয়নাঘর পরিদর্শনে যাবেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাচিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, গত বছরের আগস্টের পর ফিরে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে কয়েকটি কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান যে কক্ষে আটক ছিলেন বলে বর্ণনা দিয়েছেন, তদন্তকারীরা সেই কক্ষও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
টিএফআই সেলে আটক রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংখ্যা এখনো তদন্তাধীন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কখনো বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী, আবার কখনো জঙ্গি সন্দেহে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সেখানে আটক রাখা হতো। তাদের মধ্যে কেউ আদালতে হাজির হয়েছেন, কেউ আর ফিরে আসেননি, আবার কেউ ফিরে এসে সেখানে আটক থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে ভবনের কক্ষ, দেওয়াল ও অন্যান্য কাঠামো।
ভেতরের পরিবেশ: ছবি জাগো নিউজ
গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটনও পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ভবনের কক্ষগুলো দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান।
আটক ব্যক্তিদের গ্রেফতার দেখানো হতো নাবাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতার করা ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেফতারের কারণ জানানোরও বিধান রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়ও এ-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের অভিযোগ, টিএফআই সেলে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা অনুসরণ করা হয়নি।
আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ শুধু সাধারণ আইন লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগেরও অংশ। এ বিষয়গুলো সেই আলোকে তদন্ত করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন ‘গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত’প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে যারা এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, তাদের পাশাপাশি কার নির্দেশে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় কতটা ছিল, সেটিও সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায়) নীতির আওতায় তদন্ত করা হচ্ছে।
এর আগে ২১ জুলাই প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-১ টিএফআই সেলসহ র্যাব, ডিজিএফআই ও ডিবির কথিত গোপন বন্দিশালা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়।
চিফ প্রসিকিউটর সেদিন আদালতে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মতাদর্শের ব্যক্তিদের তুলে এনে এসব স্থানে আটকে রাখা, নির্যাতন ও গুম করা হতো। শনিবারের পরিদর্শন সেই তদন্তেরই অংশ।
সবুজ নির্মল পরিবেশের আড়ালে গোপন বন্দিশালা: ছবি জাগো নিউজ
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধি, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে।
বিচারকদের পরিদর্শন শেষে ভবনটি সাংবাদিকদের জন্যও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তখন ভবনটি আরও নির্জন মনে হচ্ছিল।
আরও পড়ুন চিফ প্রসিকিউটর / আয়নাঘরে হাত-মুখ বেঁধে রাখা হতো, আবার অনেককে হত্যাও করা হতোবাইরে গাছের ছায়া। বাতাসে পাতার শব্দ। দূরে র্যাব কম্পাউন্ডের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। ভেতরে সেই ছোট ছোট কক্ষ—৪১ ইঞ্চি উচ্চতার একটি সেল, ৫৩ ইঞ্চি উচ্চতার আরেকটি কক্ষ। এমন কিছু জায়গাও রয়েছে, যেখানে এখন আর দেওয়াল নেই; তবে জানানো হয়েছে, একসময় সেখানে আরও ছোট ছোট কক্ষ ছিল।
ধুলোমাখা মেঝে। মাকড়সার জাল। জানালাবিহীন অন্ধকার। বাইরে থেকে ভবনটির কোনো আলাদা পরিচয় নেই।
প্রসিকিউশন যে অভিযোগের তদন্ত করছে, তার মূল প্রশ্নটি এখনো এই ভবনের ভেতরেই রয়ে গেছে—এই ছোট ছোট কক্ষগুলো কেন তৈরি হয়েছিল, কারা এখানে মানুষকে আটকে রাখত এবং তাদের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?
এফএইচ/এসএইচএস