সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে নৈতিক স্খলন সম্পর্কিত নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ও কেলেঙ্কারির খবর সামনে এসেছে। বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় লেবাসধারী বা দাড়ি-টুপি পরিহিত মানুষদেরও মাঝেমধ্যে এজাতীয় নৈতিক স্খলনে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে এক লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শায়খ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, আজকাল প্রায়ই নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা শুনতে পাওয়া যায় এমন কি অনেক দাড়ি টুপি পরিহিত মানুষকেও নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িয়ে যেতে দেখা যায় এর কারণ কি এবং এর প্রতিকারের উপায় কী?
Advertisement
এই প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন,
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে বিশ্বনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফেতনার বিষয় রেখে গেলাম না।’ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘বনি ইসরাইলের প্রথম ফেতনা বা বিভ্রান্তির সূচনাও হয়েছিল নারীর মাধ্যমে।’
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন যে, এই হাদিসগুলোতে নারীদের কোনোভাবে দোষারোপ করা হয়নি; বরং পুরুষদের সৃষ্টিগত ও চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করে তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একজন পুরুষ অন্য যে কোনো বিষয়ের চেয়ে এই জায়গাতেই সবচেয়ে দ্রুত পদস্খলনের শিকার হতে পারে।
Advertisement
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। তাই অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শাস্তির ব্যবস্থার চেয়ে অপরাধের পথ রুদ্ধ করার দিকে ইসলাম বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না। (সুরা বনি ইসরাইল: ৩২)
অন্য অনেক পাপাচারের ক্ষেত্রে 'অপরাধ করো না' বলা হলেও, ব্যভিচারের ক্ষেত্রে 'নিকটবর্তী হতে নিষেধ' করা হয়েছে। কারণ, একজন পুরুষ যখন কোনো পরনারীর সৌন্দর্য অবলোকন করে, অহেতুক কথোপকথন বা মেলামেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন সে তার প্রতি আসক্ত হয়। এই আসক্তি পরবর্তীতে তাকে বাস্তব পাপাচারের দিকে পরিচালিত করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করে। শরিয়ত এই পাপের ফাঁদগুলো থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যই দৃষ্টির সংযম ও শালীনতার রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
তথাকথিত ধার্মিক বা দ্বীনি লেবাসধারী ব্যক্তিদের পদস্খলনের মূল কারণ হলো, আল্লাহর ভয় বা তাকওয়ার অভাব, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং নিজেকে ফেতনার মুখোমুখি দাঁড় করানো। কেউ যদি মনে করে তার ইবাদত বা দ্বীনি জ্ঞান তাকে পাপাচার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঁচিয়ে রাখবে এবং সে কারণে সে পরনারীর সাথে অবাধ মেলামেশা বা অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ বজায় রাখে, তবে একটি সময়ে তারও পতন ঘটে।
বর্তমান ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় চারিদিকে কেবল প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের আহ্বান জানানো হচ্ছে, আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিজেকে সামলে রাখার কথা বলা হচ্ছে না। অথচ ইসলাম আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও চরিত্র সুরক্ষার শিক্ষা দেয়।
Advertisement
এই আত্মিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
১. ঈমানী শক্তি ও তাকওয়া অর্জন: মনে সর্বদা এ কথা জাগ্রত রাখা যে, নির্জনতায় বা লোকচক্ষুর অন্তরালে যা-ই করা হোক না কেন, আল্লাহ তাআলা তা প্রত্যক্ষ করছেন।
২. সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন ও যথাসময়ে বিবাহ: নিজের চরিত্রকে কলুষমুক্ত রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো যথাসময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং পরিবারের সান্নিধ্যে থাকা।
৩. লজ্জাস্থান ও মুখের হেফাজত: রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা/মুখ) এবং দুই রানের মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান) হেফাজত করবে, তিনি তার জান্নাতের দায়িত্ব নেবেন।
৪. ফেতনার পরিবেশ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা: নিজের প্রতি অতিবিশ্বাসী না হয়ে যে কোনো ধরনের অবৈধ যোগাযোগ ও প্রলোভনের ক্ষেত্র থেকে নিজেকে সচেতনভাবে দূরে রাখা।
সুরা মুমিনুনে সফল মুমিনদের অন্যতম প্রধান গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতকে।
নিজেদের ইজ্জত ও সম্মান রক্ষা করতে হলে, ইহকাল ও পরকালে অপদস্ত হওয়া থেকে বাঁচতে হলে নবী করিমের (সা.) পবিত্র সুন্নাহ ও দিকনির্দেশনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে হবে। চরিত্র রক্ষার এই সংগ্রামেই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা নিহিত। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে যাবতীয় ফেতনা থেকে বেঁচে থাকার এবং পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
ওএফএফ