আন্তর্জাতিক

৬ মাসে সোনার দাম কমেছে ৬৭ হাজার টাকা, সামনে কী হবে?

বছরের শুরুতে অনেকটাই লাগামহীনভাবে ছুটছিল সোনার দাম। একের পর এক রেকর্ড গড়ে জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্সের দাম উঠে যায় ৫ হাজার ৫০০ ডলারেরও বেশি। তখন অনেকের ধারণা ছিল, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে সোনার এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আরও দীর্ঘ হবে।

Advertisement

কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে বদলে গেছে পুরো চিত্র। জুলাইয়ের শেষ দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নেমে এসেছে ৪ হাজার ৪৪ ডলারে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে প্রতি ট্রয় আউন্সে সোনার দাম কমেছে ১ হাজার ৪০০ ডলারের বেশি। অর্থাৎ এই সময়ে সোনার দাম ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।

আরও পড়ুন সোনা কিনে লাভবান হওয়ার উপায়

এখন প্রশ্ন, এটি কি আরও বড় পতনের ইঙ্গিত, নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ?

সোনার দাম কতটা কমলো

গত ২৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ইতিহাসে প্রথমবার ৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে)।

Advertisement

বিশ্ববাজারে সোনা-রূপার মতো মূল্যবান ধাতু বেচাকেনা হয় ট্রয় আউন্সের হিসাবে। এখানে মনে রাখা দরকার, এটি সাধারণ আউন্স নয়। সাধারণ আউন্স সমান ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম।

তবে সোনা-রুপা বেচাকেনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০ গ্রাম প্রায়। ভরিতে হিসাব করলে এক ট্রয় আউন্স দাঁড়ায় ২ দশমিক ৬৭ ভরির কাছাকাছি।

আরও পড়ুন ভরি-ক্যারেট-হলমার্ক / সোনা কেনার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

সেই হিসাবে, বছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম উঠেছিল প্রতি ভরি রেকর্ড ২ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ওপর।

আর জুলাইয়ের শেষে এর দাম নেমে এসেছে প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়।

Advertisement

অর্থাৎ, প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমেছে প্রতি ভরিতে প্রায় ৬৭ হাজার টাকা।

সোনার গহনা/ ফাইল ছবি

সোনার দাম কমার কারণ কী

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী মার্কিন ডলার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের পরিবর্তন এই পতনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এআইস্টকওয়্যার ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড হ্যান মানিওয়াইজকে বলেন, মার্চ মাসে তুরস্ক ৬০ টন সোনা বিক্রি করায় বাজারে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। এতে অনেকের ধারণা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা থেমে গেছে।

তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও মাসে প্রায় ৫০ হাজার কেজি (৫০ টন) করে সোনা কিনছে।

আরও পড়ুন ধারণার চেয়েও কমে যেতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস

ডেভিড হ্যানের মতে, বহু বছর ধরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যে কৌশল নিয়েছে, একটি ত্রৈমাসিকের পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনা বদলে দেয় না।

যুদ্ধের সময়ও কেন বাড়ল না সোনার দাম

সাধারণভাবে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ে। তবে এবার চিত্রটি ছিল কিছুটা ভিন্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই জানুয়ারিতে সোনার দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে ঝুঁকি এড়াতে আগ্রহী অনেক বিনিয়োগকারী আগেই সোনা কিনে ফেলেছিলেন।

পরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার উঁচু পর্যায়ে ধরে রাখে।

আরও পড়ুন সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন?

উচ্চ সুদের কারণে ট্রেজারি বিলের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে চার শতাংশের বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক বিনিয়োগকারী সোনার পরিবর্তে সুদভিত্তিক সম্পদে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।

সোনা ও রুপার বার/ ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সামনে কী হতে পারে

বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশেষজ্ঞ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

ডেভিড হ্যানের ভাষ্যমতে, ২০১১ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর টানা চার বছর ৪০ শতাংশের বেশি কমেছিল। অনেক বিনিয়োগকারী তখন বাজার ছেড়ে চলে যান।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে সোনার দাম আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছিল।

আরও পড়ুন সোনা কেন কিনে রাখবেন?

তার মতে, জানুয়ারির সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এখন প্রায় ২২ শতাংশ কম দামে সোনা কেনা দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।

তবে দ্রুত মুনাফার আশা করা উচিত নয়।

দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

মিয়ামিভিত্তিক আইআরএ ফিন্যান্সিয়ালের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম বার্গম্যানও দীর্ঘমেয়াদে সোনার প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন।

আরও পড়ুন ৫ বছরেই দ্বিগুণ হতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস

তিনি বলেন, সোনাকে কয়েক দিনের বা কয়েক মাসের বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে ১০ থেকে ২০ বছরের সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।

তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সম্পদ গঠনের কৌশলে সোনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের একটি মাধ্যম।

সূত্র: গোল্ড প্রাইস, ফোর্বস, এওএলকেএএ/