ভ্রমণ

শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ: সবুজের রাজ্যে একদিন

আজহার মাহমুদ

Advertisement

বন্ধুরা মিলে হিসেব করলাম প্রায় ৩০০ দিন হয়ে যাচ্ছে, একসাথে ভ্রমণ করা হয়নি। আড্ডায় সিদ্ধান্ত নিলাম এবার কমিটমেন্ট রক্ষা করে সবাই ভ্রমণ করতে যাবো। সবাই আলোচনা করে তারিখটাও ঠিক করে ফেললাম। কিন্তু আসল কাজটাই বাকি। কোথায় যাবো সেটা কেউ ঠিক করলাম না। নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে যাব। অনেকদিন ধরেই দেশের চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখার ইচ্ছা ছিল। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক আর নূরজাহান চা বাগানের সৌন্দর্যের কথা এত শুনেছি যে, আর তর সইছিল না।

নির্ধারিত তারিখে আমরা ছয় বন্ধু হাজির হলাম চট্টগ্রামের একে খান বাস কাউন্টারে। ১১টার বাসে উঠলাম, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাস ছেড়ে দিলো। আমরা রওয়ানা দিলাম শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে। সারারাত বাসে গল্প, আড্ডা আর ঘুমিয়ে ভোরের দিকে পৌঁছে গেলাম শ্রীমঙ্গলে। বাস থেকে নামতেই ঠান্ডা বাতাস আর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ আমাদের স্বাগত জানাল। চারপাশে এত সবুজ আর শান্ত পরিবেশ যে শহরের কোলাহল মুহূর্তেই ভুলে গেলাম।

বাসস্ট্যান্ড থেকে বের হয়ে প্রথমে একটা চাঁদের গাড়ি ঠিক করলাম। স্থানীয় ভাষায় এটাকে চাঁদের গাড়ি বললেও গাড়িটি মূলত জিপ গাড়ি। আমরা যেহেতু দিনে ঘোরাঘুরি করে চলে যাবো, তাই এক মিনিট সময়ও নষ্ট করা যাবে না। অনেক চেষ্টার পর একটা গাড়ি আমাদের বাজেটের সাথে মিলিয়ে সারাদিনের জন্য রিজার্ভ করতে পারলাম। সারাদিনের জন্য ভাড়া ১০ হাজার। আমাদের পুরো শ্রীমঙ্গল ঘুরিয়ে দেখাবে।

Advertisement

গাড়িতে ব্যাগপত্র রেখে সবাই পাশের একটি রেস্তোরাঁয় গেলাম। ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। শ্রীমঙ্গলে এসে সাতরঙা চা পান না করলে তো হবে না। তাই সকালের নাশতার সঙ্গে বিখ্যাত সাতরঙা চা খেলাম। এক কাপ চায়ের ভেতরে এতগুলো স্তর আর ভিন্ন স্বাদ সত্যিই অবাক করার মতো।

চা শেষ করেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। উদ্যানের ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো যেন অন্য এক জগতে চলে এসেছি। চারপাশে বিশাল উঁচু উঁচু গাছ, পাখির ডাক আর ঠান্ডা বাতাস। জঙ্গলের ভেতরের সরু পথ ধরে হাঁটছিলাম আর চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। মাঝে মাঝে বানরের দলও দেখা যাচ্ছিল। গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল ওরা। এই উদ্যানেই আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিল। সেই রেল লাইনের পাশে জায়গাটা নিজ চোখে দেখলাম।

পাশাপাশি আমরা জঙ্গলের ভেতরে বেশ অনেকটা সময় ঘুরলাম। কোথাও সূর্যের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছে, কোথাও আবার ঘন অন্ধকার। পুরো জায়গাটা যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ। ছবি তুলতে তুলতেই সময় কেটে যাচ্ছিল। এখানকার নীরবতা আর প্রকৃতির শব্দ সত্যিই অসাধারণ।

লাউয়াছড়া ঘুরে দুপুরের দিকে আমরা চলে গেলাম মাধবপুর লেকের উদ্দেশে। পাহাড়ি রাস্তা আর চা বাগানের মাঝ দিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল পুরো রাস্তার প্রতিটা দৃশ্যই যেন ছবির মতো সুন্দর। প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম মাধবপুর লেকে। দূর থেকে লেকটা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে নীলচে পানির বিশাল লেক। হালকা বাতাস বইছিল। লেকের পাশে বসে মনে হচ্ছিল সময় যেন থেমে গেছে। আমরা কিছুক্ষণ নীরবে বসে শুধু প্রকৃতিটা উপভোগ করছিলাম। এত শান্ত একটা পরিবেশ শহরে কল্পনাও করা যায় না।

Advertisement

বিকেলের দিকে আমরা গেলাম নূরজাহান চা বাগানে। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সারি সারি চা গাছ যেন সবুজ কার্পেটের মতো বিছিয়ে আছে। দূরে চা শ্রমিকরা ঝুড়ি পিঠে চা পাতা তুলছিলেন। পুরো দৃশ্যটা এত সুন্দর লাগছিল যে কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছিল এ জায়গা ছেড়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।

চা বাগানের মাঝের সরু রাস্তা ধরে আমরা হাঁটছিলাম। চারপাশের ঠান্ডা বাতাস আর চায়ের ঘ্রাণ মনটা একদম সতেজ করে দিচ্ছিল। সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল তখন পুরো চা বাগানটা যেন সোনালি রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল। এমন সুন্দর বিকেল জীবনে খুব কমই দেখেছি। সন্ধ্যার দিকে আমরা রিসোর্টে ফিরে এলাম। রাতে স্থানীয় খাবার দিয়ে জমিয়ে খাওয়া হলো। গরম ভাত, দেশি মুরগি আর পাহাড়ি সবজি দিয়ে রাতের খাবারের স্বাদ যেন অন্যরকম ছিল। খাওয়া শেষে সবাই মিলে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম।

পরদিন সকালে আবার একটু ঘুরে শপিং করলাম। শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত চা কিনলাম বাসার জন্য। এরপর দুপুরের বাসে আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। ফেরার সময় বাসের জানালা দিয়ে শেষবারের মতো সবুজ চা বাগানগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য যেন এখনো চোখে লেগে আছে। সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ ছিল অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। প্রকৃতি, পাহাড়, চা বাগান আর নীরবতার এক অপূর্ব মিশেল এই শ্রীমঙ্গল। সুযোগ পেলে যে কেউ একবার হলেও ঘুরে আসতে পারেন দেশের সুন্দর জায়গাটি।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি বাসে করে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। এসি ও নন-এসি বিভিন্ন বাস চলাচল করে এই রুটে। বাস ভেদে ভাড়া সাধারণত ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া ট্রেনেও যেতে পারবেন চাইলে।

থাকবেন কোথায়

শ্রীমঙ্গলে বিভিন্ন মানের রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেল আছে। কম বাজেটের হোটেল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল রিসোর্টও পাবেন। সাধারণত ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০-১২ হাজার টাকার রুমও পাওয়া যায়। ছুটির দিনে গেলে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়াই ভালো।

এসইউ