দেশজুড়ে

অভিভাবকহীন ফেনীর স্বাস্থ্য খাত, বিপাকে চিকিৎসক-রোগীরা

একটি জেলার স্বাস্থ্যসেবার পুরো ব্যবস্থাই নির্ভর করে দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের ওপর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সিভিল সার্জন ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে ফেনীর স্বাস্থ্য খাত।

Advertisement

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে কোনোভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয় সংকট ও সেবার ধীরগতির খেসারত দিচ্ছেন প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা হাজারো মানুষ।

ভারপ্রাপ্তদের কাঁধে দায়িত্ব

সিভিল সার্জনের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সোহরাব আল হোসাইন (সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা)। তবে তাকে ঘিরে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। তিনি বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ৩৩তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পান এবং ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)’ -এর সদস্য ছিলেন। এ বিষয়ে মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, জেনারেল হাসপাতালের মূল অভিভাবক (তত্ত্বাবধায়ক) না থাকায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টন, শৃঙ্খলা রক্ষা ও ওষুধ-চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব ঘটছে প্রতিনিয়ত। এছাড়া হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতায় চরম অবহেলার অভিযোগ করেছেন রোগীরা। সিঁড়ি ও মেঝেতে যত্রতত্র ময়লা পড়ে আছে। কয়েক দিন পর পর পরিষ্কার করা হচ্ছে।

Advertisement

আরও পড়ুন পানি নামতেই রোগের প্রকোপ / ফেনীর হাসপাতালে রাস্তা ও গাছতলায় চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় মূল প্রশাসনিক অভিভাবকত্ব বলতে এখন কিছু নেই। প্রতিদিন চিকিৎসকদের ওয়ার্ড ডিউটি বণ্টন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা কিংবা কোনো বিভাগীয় জরুরি সমন্বয় সাধনে আমাদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো স্থায়ী শীর্ষ পদাধিকারী না থাকায় ছোটোখাটো প্রশাসনিক জটিলতাও দিনের পর দিন ঝুলে থাকে, যার প্রভাব সরাসরি চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ ও রোগীদের সেবায় পড়ছে।

ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পথ্য সরবরাহ বজায় রাখা এবং নষ্ট বা অকেজো সরঞ্জাম দ্রুত মেরামতের জন্য তত্ত্বাবধায়কের প্রশাসনিক অনুমোদন অপরিহার্য। কিন্তু স্থায়ী পদাধিকারী না থাকায় নিয়মিত ফাইল স্বাক্ষর ও কেনাকাটার অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে সময়মতো চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা বা প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন দুর্ভোগে ‘হাজার’ রোগী

প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু শীর্ষ প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে তৈরি হয়েছে সমন্বয়হীনতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, স্থায়ী দায়িত্বশীল কর্মকর্তা না থাকায় জরুরি অনেক সিদ্ধান্ত ও ফাইল অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রশাসনিক এই দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল পরিচালনায়, ফলে চিকিৎসাসেবা সময়মতো পাচ্ছেন না রোগীরা।

বহির্বিভাগের রোগী দিনমজুর রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়াইছি টিকিটের জন্য। টিকিট পেতে পেতেই দুই ঘণ্টা। এরপর ডাক্তারের রুমের সামনে গিয়ে দেখি প্রচণ্ড ভিড়, কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নাই। শুনলাম হাসপাতালে কোনো বড় ডাক্তার বা মনিটরের লোক নাই, এজন্য সার্ভিস খুব স্লো।

Advertisement

গৃহিণী শাহানাজ পারভীন বলেন, ছেলের হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসি। ভর্তি করানোর পর জরুরি যে চিকিৎসা দরকার, প্রশাসনিক ঝামেলার কারণে তা পেতে অনেক দেরি হয়েছে। নার্সদের জিজ্ঞেস করলে বলে লোকবল কম, উপর থেকে কোনো সাপোর্ট নাই, আমরা কী করব? হাসপাতালে যদি অভিভাবকই না থাকে, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ রোগীদের তো কান্নাকাটি করা ছাড়া উপায় নাই।

অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী আবুল কাশেম বলেন, বাইরের টেস্ট করাতে অনেক টাকা লাগে দেখে সরকারি হাসপাতালে আসছিলাম। এসে দেখি অনেক ফ্রি ওষুধই সাপ্লাই নাই আর প্যাথলজির একাধিক মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ফাইলগুলো নাকি মাসের পর মাস আটকে থাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সিভিল সার্জন বা সুপার স্যার নাই। সরকারি এত বড় হাসপাতাল যদি অভিভাবক ছাড়া চলে, তবে রোগীরা তো ভোগান্তিতে পড়বেই।

ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠন

জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সামাজিক নেতারা। তরুণ উদ্যোক্তা সাফায়েত হোসেন মুরাদ বলেন, একটি জেলার শীর্ষ দুটি স্বাস্থ্য পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দ্রুত যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ না দিলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম রূপ নেবে।

একই দাবি জানিয়েছেন জেলার সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দও। তাদের মতে, দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার মান ধরে রাখা অসম্ভব।

আরও পড়ুন ফেনীতে ঠান্ডাজনিত রোগে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ৮০ শিশু যা বলছে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. জালাল উদ্দীন রুমী বলেন, শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা পদায়নের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পদায়ন হলে এ সংকট কেটে যাবে।

প্রাক্তন সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত করিমকে ওএসডি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিষয় এবং এ নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

জনস্বার্থে দ্রুত সমাধানের দাবি

ফেনীবাসীর একটাই প্রত্যাশা-জনস্বার্থ বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে স্থায়ী ও যোগ্য সিভিল সার্জন এবং হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ প্রদান করা হোক, যাতে ফেনীর স্বাস্থ্যসেবায় গতি ও স্বস্তি ফিরে আসে।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/এসজেডএইচ/এএসএম