একুশে বইমেলা

ফিনিক্স পোড়ানো ভাত: সহজাত ভাবকল্পের নির্ভেজাল কবিতা

মাহমুদ নোমান

Advertisement

অনেকে কবিতা লেখেন, অথচ কবিতা এসে অনেককে বলে, লেখো; কবিতা লেখার পথটি একান্তে, ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার চেয়েও যাপনের নির্ভেজাল আকুতিভরা বোধবিজ্ঞান; কবিতা লিখে কী হয় কী হয় এসব হা-হুতাশ সত্যিকার কবিকে ছুঁতেও পারে না। কবিতা এমনই সত্যির আয়না; যেখানে কবি শুধু নিজেকে দাঁড় করায়। কবিতা পেয়ে বসলে আর কিছু হয় না ঠিকঠাক। পাঠকমাত্রই কেবলই ধারণা নিয়ে এগোতে পারেন।

এসব কথা মনে মনে আওড়াতে থাকি সপ্তদ্বীপা অধিকারীর কবিতা পড়তে পড়তে। এই কবির দ্বিতীয় কবিতার বই ‘ফিনিক্স পোড়ানো ভাত’ পাঠ-পরবর্তী মনে হয়েছে, নতুন ভোরবেলা দেখার মতো পবিত্র শান্ত সরল স্বীকারোক্তি যেন; ফিনিক্স পাখি আগুনে পুড়ে ছাই হয় এবং সেই ছাই থেকেই নতুন জীবন পায়। ‘ফিনিক্স পোড়ানো ভাত’ বলতে কঠিন বা ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির পর সেখান থেকে আরেকটা নতুন স্বপ্ন বাহিত করা, আরও শক্তিশালী রূপে ফিরে আসা।

ফিনিক্স পাখিকে ‘পোড়ানো’ মানে অন্তর্দহন। বলতে পারেন আত্মাহুতি। সেখানে ‘ভাত’ বলতে নতুনত্বে দেখা ভোর-আলো-স্বপ্ন- চাওয়া কিংবা পাওয়ার একটা যোগরেখা জড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ আগুনে নয়, যেন ভাত দিয়ে পোড়ানো হয়েছে ফিনিক্স পাখি। সে পাখির মধ্যে কবির আত্মাহুতির বিচিত্র গমন এবং স্বাপ্নিক চৈতন্য ফিনিক্স পাখিকে আবার জীবন দেয় বুঝি। এমনও বলতে পারেন, ভাত দিয়ে পোড়ানোর মরমিয়া চেতনা পাখিকে জীবন দেয়। এ এক মারেফতি ধারা। এখানে আধ্যাত্মিক সরলতার ব্যাপার ঘটিয়ে দিয়েছেন কবি। স্বীকার করুক কিংবা না-করুক কবিমাত্রই আধ্যাত্মিকতার চাষা। কবি সপ্তদ্বীপা অধিকারীর কবিতা কী কেমন এটি নিরুপণ করতে গেলেই বইয়ের নামটি বলে দেওয়া যায়। মানে সপ্তদ্বীপা অধিকারীর কবিতা যেন ‘ফিনিক্স পোড়ানো ভাত’।

Advertisement

আরও পড়ুনলিটল মাস্টার: ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রেমের আখ্যান 

আমি কোনো কবিতা পড়তে গেলে খুঁজি সেই কবির কবিতা। আমার কবিতা খুঁজতে যাই না। কবিতা হোক কিংবা না-হোক সেই অমীমাংসিত কথাবার্তায় নিজেকে জড়াই না। সপ্তদ্বীপা অধিকারীর কবিতা পড়লে এতটুকু বলতে পারি, আমি সপ্তদ্বীপা অধিকারীকে পেয়েছি। যে নারী সব সময়ের আরাধ্যের এখনো ফুটে আছে, সেই সুরভি, সেই আকর্ষণের জাল বিছিয়ে আছে—ক.আসলে দেহ কখন অর্ধনারীশ্বর হয়ে যায়এ কথা লেখা আছে রাধাবিরহে।ছদ্মবেশী অলকানন্দা আসলে জল ছাড়া কিছুই নয়!প্রতিটি ঢেউ জানে, বাঁশে কেন বাজে!(অর্ধনারীশ্বর; ১১ পৃষ্ঠা)

খ.অন্তে অশ্রু অনন্তে যাইযমরাজে লেখে কপালমন্ত্রে তোমার পুড়ি ঝলসাই!পোড়ে ঘিলু, অন্তর্জাল!(অন্তর্জাল; ১২ পৃষ্ঠা)

আরও পড়ুনঅলকানন্দা শহরে: কবিতার সরোবরে অমৃত মন্থন 

গ.ঘর থেকে দুয়ার থেকে নেই হওয়া যায়, বিদায় নেওয়া যায় সমস্ত সুগন্ধি থেকে, সমস্ত জমির আলসীমানা বেমালুম ভুলে যেতে পারো,শব্দ-স্পর্শ-স্মৃতি সব হয়ে যেতে পারে বেওয়ারিশ লাশ।(অমরত্ব; ১৪ পৃষ্ঠা)

সপ্তদ্বীপা অধিকারীর কবিতা মূলত প্রেমময়ীর ডাক। সহজ সরল মাটি সংলগ্ন অনুভব। রিদ্মিক দোলনের চমৎকার প্রীতি। বাড়তি কোনো কথা নেই। নিরীক্ষার নামে বাড়াবাড়ি নেই। একটা কোমল সম্প্রীতি হৃদয়-গভীর থেকে মস্তিষ্কে টোকা মারে। শব্দিত স্পন্দন পাঠককে আকৃষ্ট করে। চিত্রিত ভাবকল্পে এই কবি নিজেতে মগ্ন। কোন কবিতাটি অনন্তকালে টিকে যাবে; সেটি সময়ের কাছে আপাতত থাকুক—‘আমি আজীবন শূন্যতা-পিয়াসীযতবার বান এসেছে, মধ্য গগন হারিয়েছি হেলায়...মগজে শান দিতে গিয়ে টের পেয়েছিমগজ বিক্রি হয়ে গেছে সামাজিক দেনায়।’(আত্মগোপন; ১৯ পৃষ্ঠা)

Advertisement

কবি সপ্তদ্বীপা অধিকারী উপমায় উৎপ্রেক্ষায় ছন্দের গীতিময়ে বেশ সাবলীল। সহজাত সুরারোপিত ইশারার চমকিত ভাষা। নতুন করে ভাবতে পারার সাহসী উচ্চারণ যেন ‌‘ফিনিক্স পোড়ানো ভাত’ কবিতার বইটি।

এসইউ