মতামত

ব্যাটারিচালিত রিকশা: জ্বালানি সংকটে আশার আলো, নাকি অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি?

বাংলাদেশের নগর ও নগর-সংলগ্ন জীবনে ব্যাটারিচালিত রিকশা আজ এক অনিবার্য বাস্তবতা। ঢাকার ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলের পাকা রাস্তাতেও এর উপস্থিতি এখন নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। হঠাৎ করে এই যানবাহনের উত্থান হয়নি; বরং জ্বালানি সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়ের চাপ এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত সমাধান হিসেবে গড়ে উঠেছে। একদিকে এটি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য বিকল্প, অন্যদিকে এটি আইন, নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে জটিল এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই যানটিকে কীভাবে নিরাপদ, যুগোপযোগী এবং আইনগতভাবে বৈধ করে একটি টেকসই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়?

Advertisement

জ্বালানি সংকট ও বিকল্পের বাস্তবতা

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশও এই প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ডিজেল ও পেট্রোলচালিত যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিতে বোঝা বাড়াচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা বাংলাদেশের নগর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। এটি জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প, আবার একই সাথে এটি নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি—যেখানে নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা একসাথে বিবেচিত হবে। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এটিকে একটি বৈধ ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটি জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার একে একটি নীতিগত সংকটে পরিণত করেছে।

Advertisement

সম্ভাবনা, সমস্যা এবং রূপান্তরের প্রয়োজন

১. অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক গুরুত্ব

ব্যাটারিচালিত রিকশা হাজারো মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। শহরে আগত দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ অল্প পুঁজি নিয়ে একটি রিকশা কিনে আয় শুরু করতে পারছে। এটি তাদের জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে।

গ্রামীণ অভিবাসীদের জন্য এটি একটি দ্রুত কর্মসংস্থানের মাধ্যম। দিনমজুরি বা অনিয়মিত আয়ের পরিবর্তে এটি তুলনামূলক স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে এটিকে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হলে ব্যাপক সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।

২. জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা

Advertisement

জ্বালানি সংকটের সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি বিকল্প হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটি পেট্রোল বা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমায় এবং শহরের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস। যদি বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, তাহলে এর পরিবেশগত সুবিধা সীমিত হয়ে যায়। তাই এই যানকে টেকসই করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

৩. নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থার সংকট

ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত বিস্তার সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনেক যানবাহন অবৈধভাবে চলছে, যেগুলোর কোনো মানদণ্ড নেই। চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এছাড়া, শহরের সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে এই যানবাহনের সমন্বয় না থাকায় যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্দিষ্ট লেন না থাকা, গতিসীমা না মানা এবং ট্রাফিক নিয়ম উপেক্ষা করা—এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।

৪. পরিবেশগত দিক ও চ্যালেঞ্জ

ব্যাটারিচালিত রিকশা সরাসরি কার্বন নিঃসরণ না করলেও এর পরিবেশগত প্রভাব পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। ব্যাটারি নিষ্পত্তি একটি বড় সমস্যা। সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি যদি সঠিকভাবে রিসাইকেল না করা হয়, তাহলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস এবং চার্জিং ব্যবস্থার দক্ষতা—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই পরিবেশবান্ধব করতে হলে একটি সার্বিক নীতি প্রয়োজন।

৫. যুগোপযোগী ও নিরাপদ ব্যবস্থার জন্য করণীয়

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে টেকসই, নিরাপদ এবং আইনগতভাবে বৈধ করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য:

ক. নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

প্রথমত, সব ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে, যাতে অবৈধ যানবাহন চিহ্নিত করা যায়। এতে সরকার রাজস্বও পাবে এবং নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠিত হবে।

খ. চালকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা নির্ধারণ

চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। ট্রাফিক আইন, নিরাপত্তা, এবং আচরণগত প্রশিক্ষণ প্রদান করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও স্বাস্থ্যমানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত।

গ. গতিসীমা ও নকশাগত মান নির্ধারণ

রিকশাগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট গতিসীমা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত মান (যেমন—ব্রেক, লাইট, হর্ন) বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে।

ঘ. নির্দিষ্ট রুট ও লেন নির্ধারণ

নগর পরিকল্পনায় এই যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট রুট বা লেন নির্ধারণ করা উচিত। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং সড়ক নিরাপত্তা বাড়বে। বড় সড়কে প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে।

ঙ. ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা

ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ করে নিরাপদভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে হবে। এতে পরিবেশ দূষণ কমবে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

চ. বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন

সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। এসব যানবাহন চার্জ করতে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট (MW) বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।

দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ: সারাদেশের সকল ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ২৪,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা (MWh) বা ২.৪ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

মাসিক মোট খরচ: প্রতি মাসে সারাদেশে এই খাতে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৭২০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (GWh) বা ৭২ কোটি ইউনিট।আর্থিক মূল্য: বাণিজ্যিক বিদ্যুতের গড় দাম বিবেচনা করলে, প্রতি মাসে সারাদেশে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের বাজারমূল্য প্রায় ৭৫০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা।

মোট রিকশার সংখ্যা ৬০ লাখ+ (সারাদেশে)দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা ৭৫০ - ৮০০ মেগাওয়াটএকটি রিকশার দৈনিক চার্জ ৬ - ৯ ইউনিটমাসিক মোট ইউনিট খরচ ৭২ কোটি ইউনিট (প্রায়)।

অবৈধ চার্জিং: গবেষণায় দেখা গেছে, চার্জিংয়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৯০%) অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা সরকারের জন্য বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

চাহিদার ওপর প্রভাব: এই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাধারণত রাতে (অফ-পিক সময়ে) চার্জ দেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ট্রান্সফর্মারের ওপর চাপ বাড়িয়ে লোডশেডিং বা বিভ্রাটের সৃষ্টি করে।

চার্জিং স্টেশনগুলোকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।

কেস স্টাডি: ঢাকার কড়াইল বস্তির জীবন

ঢাকার কড়াইল বস্তির ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের জীবন এই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তিনি আগে দিনমজুর ছিলেন। আয় ছিল অনিয়মিত। এখন রিকশা চালিয়ে তিনি মাসে একটি নির্দিষ্ট আয় করতে পারেন, যা তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।তিনি বলেন, “এই রিকশা না থাকলে আমার সংসার চালানো কঠিন হতো।” তবে তিনি একই সাথে স্বীকার করেন যে, অনেক সময় পুলিশি ঝামেলা এবং দুর্ঘটনার ভয় থাকে।

এই কেস স্টাডি আমাদের দেখায়—এই যানবাহন শুধু পরিবহন নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাল। তাই এটিকে বন্ধ করার পরিবর্তে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি।

নিয়ন্ত্রণ ও রূপান্তরের সমন্বয়

ব্যাটারিচালিত রিকশা বাংলাদেশের নগর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। এটি জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প, আবার একই সাথে এটি নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।

এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি—যেখানে নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা একসাথে বিবেচিত হবে। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এটিকে একটি বৈধ ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে।

নিরাপদ সড়ক, সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি টেকসই নগর পরিবহনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু একটি যানবাহন নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার এক জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এএসএম