স্বাস্থ্য

রোগীর অতিরিক্ত চাপ আর গরমে ভোগান্তি চরমে

মায়া। বয়স ৮ মাস। জ্বর ও খিচুনি হয়েছিল গতকাল রাতে। তখনই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে শিশুটিকে নিয়ে আসা হয় রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। কিন্তু তখন কোনো শয্যা খালি ছিল না। কর্তৃপক্ষ বলেছিল, রাতে অন্য কোনো হাসপাতালে রাখতে। তবে কোথাও সুযোগ না পেয়ে পরে বাসায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) আবার আনা হয়েছে।

Advertisement

দুপুরে মায়াকে নিয়ে হাসপাতালের ফ্লোরে বসেছিলেন মা মুক্তা আক্তার। তখন জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, চিকিৎসক শিশুটিকে অক্সিজেন দিতে বলেছেন। ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে অক্সিজেন দেয়নি। তারা বলে, ‘আমরা কতক্ষণ দেবো?’

জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ- সবখানেই ছিল রোগীর চাপ। ওয়ার্ডের শয্যা, অপেক্ষাগারের চেয়ার ছাপিয়ে রোগী নিয়ে স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন করিডোরে, গাছতলায় এমনকি সড়কে।

শয্যার ব্যবস্থা হয়েছে কি না জানতে চাইলে মুক্তা বলেন, অক্সিজেনসহ শয্যা লাগবে। এর ব্যবস্থা করতে পরিচিত এক চিকিৎসকের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করছেন। বিকেল ৩টার পর শয্যা খালি হলে দেবে। শুধু মায়া নয়, এমন শত শত অসুস্থ শিশু নিয়ে সোমবার দুপুরে শিশু হাসপাতালে অভিভাবকদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ফটক দিয়ে ঢুকতেই দুই ধারে রোগী ও তাদের স্বজনদের বিপুল উপস্থিতি চোখে পড়ে। ভেতরে অবস্থা আরও ভয়াবহ। জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ- সবখানেই ছিল রোগীর চাপ। ওয়ার্ডের শয্যা, অপেক্ষাগারের চেয়ার ছাপিয়ে রোগী নিয়ে স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন করিডোরে, গাছতলায় এমনকি সড়কে।

Advertisement

সকালে মানিকগঞ্জ দৌলতপুর থেকে আসা রুবেল হোসেন জানান, তার ছেলে তানজিদের (৩) হার্নিয়ার সমস্যা। চিকিৎসক দেখিয়েছেন। এখন ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচার করা লাগবে। ভর্তির জন্য ফ্লোরে বসেই অপেক্ষা করছেন তারা। রুবেল বলেন, ‘সিট খালি থাকলে ভর্তি দিবে বলছে। তাই অপেক্ষায় আছি।’

পাঁচ বছর বয়সী শোয়াইব মা-বাবা ও নানির সঙ্গে বগুড়া থেকে এসেছে। প্রশ্রাবের রাস্তায় সমস্যা থাকা শিশুটিকে ভর্তি দিয়েছেন চিকিৎসক। তারাও শয্যার আশায় ফ্লোরে বসে অপেক্ষা করছিল।

আরও পড়ুনহাসপাতাল ভবন আছে, সেবার কার্যক্রম নেইবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালডেঙ্গুর দুঃস্বপ্ন না কাটতেই বরগুনায় হাম-ডায়রিয়ার হানা, গবেষণার দাবি

একইভাবে ফ্লোরে ১০ মাস ও পাঁচ বছর বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে বসেছিলেন এক দম্পতি। তারা জ্বর ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত ছোট মেয়েটিকে চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে এসেছেন। শিশুটির বাবা জুয়েল শেখ বলেন, ‘আমরা এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। দেখানোর পর হয়ত নিজেদের করণীয় ঠিক করবো।’  হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৭০০ শয্যার এ প্রতিষ্ঠানে তিন-চার গুণ রোগীর চাপ সামাল দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। এখানকার রোববারের (১৯ এপ্রিল) তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, বহির্বিভাগে রোগী এসেছিল ১ হাজার ৪০১ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৬১ শিশু। মারা গেছে পাঁচজন।

Advertisement

এমন রোগীর চাপ নতুন নয়। প্রতিদিনই হয়। ৭০০ বেডের হাসপাতালে তিন-চারগুণ বেশি রোগী আসে। আমাদের সামর্থ্য বা সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।- অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম

হাসপাতালটিতে ক্রমাগত বাড়ছে নিউমোনিয়ার রোগী। এখানে হামের রোগী আছে ৬৯ জন। এর মধ্যে পুরোনো ৬৪ এবং নতুন ভর্তি পাঁচজন।

এদিকে, রোগী ও স্ববজনদের জন্য লোডশেডিং অতিরিক্ত সমস্যা হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে জেনারেটর চলার কারণে আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালের বেজমেন্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। যদিও তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। নিজস্ব কর্মী ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক বলেন, ‘দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে শিশু হাসপাতালের বেজমেন্টে আগুন লাগার খবর পাই আমরা। এরপর মোহাম্মদপুর থেকে দুটি ও কল্যাণপুর থেকে দুটি ইউনিট গিয়ে ১টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ১টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়।’

এই আগুন লাগার খবরে হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতাল ছেড়ে রোদের মধ্যেই অনেকে বাইরে বের হয়ে আসেন। এছাড়া, দুর্ঘটনার পর থেকে বিদ্যুৎ ছিল না। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মোবাইল ফোনের আলো এবং হাতপাখা ও ফাইলের বাতাস ছিল ভরসা। এতে ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। ঘেমে একাকার হয়ে যায় ছোট ছোট শিশু ও তাদের মা-বাবা।

আরও পড়ুনস্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণে কাজ শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রীঅতীতের পলিসি-দুর্নীতির ফলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন মেরামতের অযোগ্যতরুণ ডায়াবেটিস রোগীদের ৫ জনে ১ জন ‘মডি’তে আক্রান্ত: গবেষণাযোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগুনের বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। আর এমন রোগীর চাপ নতুন নয়। প্রতিদিনই হয়। ৭০০ বেডের হাসপাতালে তিন-চারগুণ বেশি রোগী আসে। আমাদের সামর্থ্য বা সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’ এসইউজে/একিউএফ