ভ্রমণ

মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি হতে পারে দর্শনীয় স্থান

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের টুবিয়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি হতে পারে দর্শনীয় স্থান। দৃষ্টিনন্দন পুরোনো বাড়িটি অবহেলা, অযত্ন আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এখনই বাড়িটি সংস্কার না করলে হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে কেউ বসবাস না করায় অনেকেই এ বাড়িকে ভূতের বাড়িও বলে থাকেন। ফলে পরিত্যক্ত বাড়িটিকে ঘিরে জন্ম হয় নানা রূপকথার।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের টুবিয়া গ্রামে ব্রিটিশ আমলে নির্মাণ করা হয় বাড়িটি। সুজয় সারেং নামের এক দারোগা বাড়িটি নির্মাণ করেন। একটি দোতলা ঘর ও একটি বৈঠকখানা নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া বাড়ির চারপাশে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপরে নানা ফল ও ফুলের গাছ লাগানো হয়। বাড়ির পাশে পুকুর নির্মাণ করে সেখানে ঘাট বাঁধানো হয়। ওই সময় এলাকায় তাকে অনেকেই জমিদার হিসেবে চিনতেন।

সুজয় সারেং-এর বংশধররা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ভারতে চলে যান। পরে এখানে হাসেন মাতুব্বর নামে একজন বসবাস শুরু করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে বাদশাহ মাতুব্বর এ বাড়িতে স্ত্রী রিজিয়া বেগম ও তিন ছেলে জসিম মাতুব্বর, ওয়াসিম মাতুব্বর ও রুবেল মাতুব্বরকে নিয়ে বসবাস করতেন। দিনদিন পুরোনো বাড়িটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পাশেই তারা টিন দিয়ে ঘর নির্মাণ করে থাকেন। তবে বাদশাহ মাতুব্বরের ছেলেরা কাজের জন্য বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। এখন রিজিয়া বেগম ও তার এক ছেলের বউ থাকেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কালের বিবর্তনে বাড়িটি আজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। দেওয়ালজুড়ে বটগাছের শাখা-প্রশাখা ও শেকড়ে আবদ্ধ হয়ে আছে। জানালা-দরজা ভেঙে গেছে। দেওয়ালের ইট খসে খসে পড়ছে। তাই বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সুশীল সমাজ।

Advertisement

আরও পড়ুনঘুরে আসুন পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়ি 

কথিত আছে, বেশ কয়েক বছর আগে বাড়ির সবাই ঢাকা থাকার সুবাদে স্থানীয় কয়েক যুবক বাড়ির ছাদে উঠে জুয়ার আসর বসাতেন। বিভিন্ন ধরনের নেশা করতেন। তখন আশপাশের মানুষজন ছাদের ওপর মিটিমিটি আলো জ্বলতে দেখে ও কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ভাবতেন ভূত এসেছে। প্রবাদ আছে, পুরোনো বাড়িতে ভূত থাকে। এরপর থেকে অনেকেই এ বাড়িকে ভূতের বাড়ি বলে থাকেন। অনেক টিকটকার এখানে এসে ভিডিও করে ভূতের বাড়ি বলে প্রচার করেন। তাই দিনদিন এটি ভূতের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

বাড়িটির বাসিন্দা রিজিয়া বেগম বলেন, ‘প্রায় ৫০ বছর আগে বাদশা মাতুব্বরের সাথে বিয়ে হলে এ বাড়িতে আসি। পুরো জীবন কেটে গেল এ বাড়িতে। বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়িটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই পাশেই টিন দিয়ে ঘর তুলে থাকছি। আমার স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় এ জমি লিজ নিয়েছেন। এরপর থেকে এখানে শান্তিতে থেকেছি। কয়েক বছর আগে স্থানীয় কিছু মানুষের নজর পরে বাড়িটির দিকে। এরপর থেকে আমাদের তাড়ানোর নানা ফন্দি আটে।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় কিছু ছেলে বাড়ি ফাঁকা পেয়ে জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। আমাদের কিছু মালামাল চুরি করে নিয়ে যায়। রাতে তারা ছাদে উঠে নেশা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছেলেগুলো এ বাড়িতে ভূত আছে বলে এলাকায় ছড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে অনেকেই এটাকে ভূতের বাড়ি বলে। এখানে ভূত বলে কিছু নেই। বিয়ের পর থেকে এখানে থাকছি কিন্তু কখনো ভূত দেখিনি। বাড়িটি দখল নেওয়ার জন্যই এলাকার কিছু মানুষ ভূতের বাড়ি বলে অপপ্রচার করছে। যাতে আমরা ভয়ে এখান থেকে চলে যাই।’

স্থানীয় ওমর হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি। তাই এটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’

Advertisement

আরও পড়ুনকালের সাক্ষী আলেকজান্ডার ক্যাসেল 

মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের নির্বাহী পরিচালক এবিএম বজলুর রহমান খান বলেন, ‘স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য প্রত্নতত্ত্ব ও সরকারের কাছে বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানাই। যাতে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য নতুনরা জানতে পারেন, দেখতে পারেন।’

মাদারীপুরের লোক-সংস্কৃতি ও ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘ধারণা করা হয় বাড়িটি প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো। বর্তমানে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। সরকারিভাবে বাড়িটিকে রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বাড়িটি যদি এখনই সংস্কার করে রক্ষার জন্য এগিয়ে না আসা হয়, তাহলে এটি একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য মূল্যবান বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত করে রক্ষা করার দাবি জানাই।’

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘সরেজমিনে গিয়ে বাড়িটির ভ্যালু অনুযায়ী জেলা প্রশাসক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে এটি সংরক্ষণের কথা জানানো হবে। খোঁজ-খবর নিয়ে পুরোনো বাড়িটির ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এওয়াইএসএ/এসইউ