অর্থনীতি

রেমিট্যান্সে রেকর্ড, নতুন নতুন জেলায় বাড়ছে প্রবাসী আয়

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে যখন অশনিসংকেত, তখনও নতুন করে আশার আলো হয়ে উঠছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত এই অর্থ। সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা এই বৈদেশিক মুদ্রার উচ্চ প্রবাহে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন জেলা।

Advertisement

এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের নতুন মাইলফলক স্পর্শ এবং টানা কয়েক মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাহ বজায় থাকা প্রমাণ করে—প্রবাসীরা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আস্থা নিয়ে বৈধপথে অর্থ পাঠাচ্ছেন।

আশার কথা, আগে দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন নতুন নতুন জেলা রেমিট্যান্স প্রবাহে যুক্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় রেমিট্যান্স বৃদ্ধির বিস্তার একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে যেখানে একক মাসে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল, সেখানে চলতি বছরের মার্চ মাসে সেই রেকর্ড ভেঙে ৩৭৫ কোটি ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। দেশের ইতিহাসে এক মাসে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স এর আগে কখনো আসেনি।

এছাড়া, গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা চার মাস ধরে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Advertisement

বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের ডলারের দামের সঙ্গে খোলাবাজারের ব্যবধান কমে আসায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।-বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যাটিস্টিকস বিভাগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জেলাভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রেমিট্যান্স আহরণে নতুন নতুন জেলা এগিয়ে আসছে। যেসব জেলায় আগে রেমিট্যান্স ওঠানামা করতো, সেসব জেলায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে দেশের বাইরে গেছেন ১০ লাখ ৭৪ হাজার ১৫৯ জন প্রবাসী। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৯ হাজার ১৪৬ জন।

আরও পড়ুনরেমিট্যান্সের পতনে আরও বড় চাপে পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি: দ্য ইকোনমিস্ট১৯ দিনেই রেমিট্যান্স ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালোস্বেচ্ছায় মালয়েশিয়া ছেড়েছেন ২ লাখ অভিবাসী, তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়

Advertisement

তবে প্রবাসে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যায় ২০২৩ সালে। ওই বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১৩ লাখ ৯ হাজার ৮১১ জন শ্রমিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।

এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই দেশে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বৈদেশিক আয় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, হুন্ডি কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ডলারের দামের ব্যবধান কমে আসায় বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরাও এই মতের সঙ্গে একমত, তবে তারা এই প্রবণতা ধরে রাখতে প্রবাসীদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

যেসব জেলায় রেমিট্যান্স বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও সিলেট, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর, খুলনা বিভাগের বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর এবং বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলায় প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

উল্লেখযোগ্য জেলার চিত্র

ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইলে চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

নরসিংদী জেলায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ২৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলার এসেছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২৬ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৭২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার মাধ্যমে আলোচিত সময়ে এসেছে ২৯ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২৫ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৪ কোটি ৮৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

ঢাকা বিভাগের আরেক জেলা শরীয়তপুর জেলার মাধ্যমে আলোচিত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছে ১৯ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৮ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। সে হিসাবে গতবারের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এক কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার বেশি এসেছে। কিশোরগঞ্জ জেলার মাধ্যমে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছে ২৬ কোটি ২১ লাখ ডলার, যা গতবারের একই সময়ে এসেছিল ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার। আলোচিত সময়ে ৪ কোটি ১০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৭ কোটি ১৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের ৮৬ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বেশি।

এই বিভাগের আরেক জেলা লক্ষ্মীপুরেও রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ৯০ হাজার ডলার বেশি। বরিশালের ভোলায় রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার বেশি।

আরও পড়ুনঅস্থির মধ্যপ্রাচ্য, রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কামার্চে এলো সর্বকালের রেকর্ড রেমিট্যান্স বিদেশি কর্মীদের জন্য কঠোর নিয়ম, দক্ষ জনশক্তি হারানোর শঙ্কা

সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জে রেমিট্যান্স এসেছে ২১ কোটি ৭৬ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ কোটি ২ লাখ ৯০ হাজার ডলার বেশি। একইভাবে সিলেটে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ৮০ হাজার ডলার বেশি।

রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্স বেড়ে হয়েছে ১১ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার বেশি।

ময়মনসিংহের জামালপুরে এসেছে ৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলার বেশি। খুলনা বিভাগের বাগেরহাটে রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং সাতক্ষীরায় ৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।

এদিকে বরাবরই দেশের বিভাগীয় জেলার মধ্যে সদর জেলাগুলোয় রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেশি থাকে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছে ৭৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫২৮ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সে হিসাবে গতবারের চেয়ে ২১৩ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম জেলার মাধ্যমে আলোচিক সময়ে এসেছে ১৭০ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, যা তার আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১২৮ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। সে হিসাবে গতবারের একই সময়ের চেয়ে ৪২ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার মাধ্যমে এসেছে ১৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার, গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছিল ১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার। যদিও আলোচিত সময়ে সদর জেলায় কিছুটা কমে এসেছে। খুলনা বিভাগের খুলনা জেলার মাধ্যমে এসেছে ৯ কোটি ১৫ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ছিল ৯ কোটি ৯১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বিভাগটির মধ্যে সদর জেলার চেয়ে যশোর ও কুষ্টিয়া জেলার মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স আসে।

ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলার মাধ্যমে অলোচিত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছে ১৬ কোটি ৪২ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৭ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আলোচিত সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ কিছুটা কমেছে। রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী জেলার মাধ্যমে আলোচিত সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৭ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা গতবারের একই সময়ে এসেছিল ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসা জেলার মধ্যে রয়েছে বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা। রংপুর বিভাগের রংপুর জেলার মাধ্যমে চিলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, গতবারের একই সময়ে এসেছিল ৬ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আলোচিত সময়ে জেলাটিতে রেমিট্যান্স কমেছে এক কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এ বিভাগের মধ্যে বেশি রেমিট্যান্স আসা জেলার মধ্যে রয়েছে দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।

আলোচিত সময়ে সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার মাধ্যমে এসেছে ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসেছিল ৭৩ কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আলোচিত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ১২ কোটি ৭০ লাখ ৮০ হাজার ডলার বেশি এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের ডলারের দামের সঙ্গে খোলাবাজারের ব্যবধান কমে আসায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।’

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম. হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা জরুরি। তিনি বৈধপথে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং প্রবাসীদের জন্য আরও সহায়ক নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেন।’

ইএআর/ইএ/এএসএ/ এমএফএ