একুশে বইমেলা

মাতাল পূর্ণস্নান: মুখোমুখি অনুসন্ধান

আনিফ রুবেদ

Advertisement

‌‘পূণ্যস্নান’ নয় ‘পূর্ণস্নান’। তাও আবার পূর্ণস্নানটি মাতাল। ‘মাতাল পূর্ণস্নান’ কবি গোলাম মোর্শেদ চন্দনের বই। বইয়ের নামটিই জানান দেয়, এ বই নতুন একটা কিছুর মুখোমুখি করতে চায়। সেটা কী? তারই খোঁজ করছিলাম।

কবি গোলাম মোর্শেদ চন্দনের কবিতার কৌশল আর অবকাঠামো গড়ে উঠেছে গভীর কোনো বোধের থেকে। এ বোধকে যদি জল বলি, তাহলে এতে প্রচুর পরিমাণ বুদ্বুদ রয়েছে; রয়েছে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। ফলে শুধু জলের স্বাদ পাবার সম্ভাবনা থাকে না; জলের ভেতর থাকা জলজদেরও ঘাঁই দেখতে হয়; জলের নাচ আর গীত শুনতে হয়; বৈপরীত্যের সচেতন ব্যবহারও লক্ষণীয়। যেমন- ‘...উপলব্ধি...’ কবিতায় তিনি ‘মুছে যাক বন্ধনী’ বললেও পুরো কবিতার শরীরে তিনি তিনটি বন্ধনীই ব্যবহার করেছেন।

খুব সীমিত কিন্তু গভীর পথের ভেতর দিয়ে তার বোধ চলাফেরা করে; কথা নয় কথার আভাস; ব্যথা নয় ব্যথার আভাস দিয়ে তার কবিতার শরীর নির্মিত। কবিতার গায়ে এরকম একটা অবয়ব আনতে গিয়ে তিনি প্রচুর ত্রিবিন্দুর (...) ব্যবহার করেছেন। হ্যাঁ, এই ত্রিবিন্দুর ব্যবহার, স্পেসের ব্যবহার করে কবি যেন ধরা দিয়েও ধরা দিতে চান না; তেমন এমন একটা চমৎকার দূরত্ব তৈরি করেন। যেখানে কবি ও পাঠক বসে থাকতে পারেন; দূর থেকেই নানাকথা বলে নিতে পারেন।

Advertisement

শক্তিশালী শেকড়ের সূর্য হবার সাধ আমাদের যে পূর্ণ হয় না কখনো; ভাসমান কচুরিপানা হয়ে উঠি। সেই কথা কবি চমৎকার ভাবে বলেছেন, ‘ভেলা’ কবিতায়—‘রোদ পোহাতে হয়নি রুদ্রের অনির্বাণে।আমরা          শেষমেষ                       কচুরিপানা...’তার কবিতার শরীর নিয়ে বলার সময় যে ত্রিবিন্দু আর স্পেসের কথা বলছিলাম, তা দূরত্ব তৈরি করে বটে কিন্তু শেষে আক্ষরিক অর্থেই মিলনাত্মক হয়ে ওঠে। এর উদাহরণ ‘সপ্তর্ষি’ কবিতা। এখানে ‘তিল’ ও ‘বিল’ শব্দের ব্যবহার এবং অবস্থান বেশ লক্ষণীয়।

আরও পড়ুনদ্য আলকেমিস্ট: জীবাত্মা ও পরমাত্মায় একাত্মতার সুর 

পৃথিবীর পরিবর্তন, নগরায়ন, প্রকৃতির বিপন্নতা, মানুষের অসভ্য সভ্যতা সম্পর্কে অনেক বাক্যই রয়েছে; যেগুলো আমাদের ভেতরকে নাড়া দেয়, স্নায়ুর ভেতর সাড়া দেয়। যেমন-‘সভ্যতার অসভ্য ভাঁড়ার’(স্নান)‘নগর নিয়ে গেছে মাটি ভরা প্রাণ’(সংখ্যাতত্ত্ব)‘বিবাদের দোকানে খিল, উপড়ে ফেল শেকড়সমেত।’(খোঁয়াড়ে চন্দ্রগ্রহণ, মাতাল পূর্ণস্নান)‘আমাকেই তুলে দিচ্ছি সভায়, পরোয়ানা আমার হাতে;’(বিচারাদেশ)‘শুক্লা দ্বাদশীকে বলি-উনুনটা তৈরি রেখ রাঁধুনীপৃথিবীর হৃৎপিণ্ডকে রাঁধবে আগামীর কয়লা।’(খোয়াবনামা)

কবির হৃদয়ে বাস করে যেমন কবিতা; তেমনই কবিতার হৃদয়ে বাস করে কবি। কবিতা পড়ে আমরা কবিকে, কবির হৃদয়কেও অনেকটা বুঝে নিতে পারি হয়তো। তিনি বলছেন—‘কোলাহলকে নীরবতা বানায় কবিতা, ও ঘরে-ই আছি বেশ!’(কবিতা হবো)কবির ভালোবাসা বিশ্বময়ী এবং তার ব্যথা বেদনাটাও বিশ্বের সমান। ‘এক টুকরো ভূগোল’, ‘বিচারাদেশ’, ‘কবি ও মানুষ’ কবিতাগুলো পাঠ করলেই এর সত্যতা দেখা যায়।

শব্দের, বোধের, বাক্যের খেলা বেশ ভালোই খেলেছেন কবি। ‘অবিবাহিত ভুল’, ‘পূর্ণস্নান’, ‘অমাবর্ষা’ ‘...শেষ দিয়ে শেষ নয়... শেষ থেকে শুরু...’, ইত্যাদি বেশ ভালো লাগে।বইটিতে মুক্ত ছন্দের কবিতা বেশি হলেও অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও কম নয়; ‘সাত সমুদ্র’, ‘আফ্রোদিতি’, ‘আলোছায়া’ ইত্যাদিসহ আরও রয়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুনএখানে কয়েকটি জীবন: যে গল্প হৃদয়ে গাঁথা 

এ লেখা এখানেই শেষ। তবে বই থেকে একটা কবিতা পড়ার জন্য এখানে দিয়ে নিতে চাই—

আত্মমৈথুন

ঘুমহীন রাতগুলো অপারেশন থিয়েটারে রেখেনিজেই হয়ে উঠি গবেষণার বিষয়বস্তুতুমি এসে নীরবে-ই কড়া নাড়ো শাণিত ছুরিআমাকে-ই কেটে ছিঁড়ে তৈরি করো গবেষণাপত্রসেই থেকে ঘাতক হয়ে উঠি নিজেই নিজের;প্রতিরাতে নিজেকে কেটে ছিঁড়ে সেলাই করি পুনরায়শুকায় না ক্ষত। সম্পূরক শুল্কের মতোঅতিরঞ্জিত করের বোঝায় নিজেকে সঁপে দিয়ে দেখি—ক্ষতগুলো গুণিতক বেড়ে গিয়েধ্বংসের চোরাকাঁটা বিদ্ধ হয় ঝর্নাধারায়যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধবাজ হয়ে উঠে বৃত্তান্তের বৃত্ত

ভালোবাসা কবি গোলাম মোর্শেদ চন্দনের জন্য। তার কবিতায় পূর্ণস্নান হোক সকলের।

এসইউ