আন্তর্জাতিক

আর দুদিনের মধ্যেই কি শেষ হবে ইরান যুদ্ধ?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। তিনি শুধু বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকবে ও পরবর্তী আলোচনার জন্য ইরানের ‘প্রস্তাব’ অপেক্ষা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে- আর দুদিনের মধ্যেই কি এই যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য হবেন ট্রাম্প? কারণ, দেশের ভেতরেই তার সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে, যা নির্ধারিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে।

Advertisement

আইন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে চলতি বছরের ১ মে’র মধ্যে ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। ‘যুদ্ধ ক্ষমতা আইন’ নামে পরিচিত এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো চলমান সংঘাতে ৬০ দিনের বেশি সেনা মোতায়েন রাখতে চাইলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হবে। নইলে তাকে সেই মোতায়েন সীমিত করতে হবে।

এই অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ ও উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’ উভয় কক্ষেই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি যৌথ প্রস্তাব পাস করতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত তা হয়নি।

এদিকে, অতীতে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই এই আইন পাশ কাটিয়ে গেছেন ও অন্য আইনি ভিত্তি দেখিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন।

Advertisement

যুদ্ধ ক্ষমতা আইন কী?

১৯৭৩ সালে প্রণীত এই ফেডারেল আইনটির উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে সশস্ত্র সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করা। আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসকে জানাতে হবে ও কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বাহিনী মোতায়েন রাখা যাবে। প্রয়োজনে কংগ্রেস আরও ৩০ দিনের সময় বাড়াতে পারে বা দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক আইন বিশেষজ্ঞ মারিয়াম জামশিদি বলেন, ৬০ দিনের সময়সীমা ৩০ দিন বাড়াতে হলে প্রেসিডেন্টকে লিখিতভাবে কংগ্রেসকে জানাতে হবে যে চলমান সামরিক অভিযান ‘অপরিহার্য সামরিক প্রয়োজন’ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ৯০ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলে, কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে বা অনুমোদন না দিলে প্রেসিডেন্টকে বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।

তবে মারিয়াম জামশিদি উল্লেখ করেন, বাস্তবে কংগ্রেসের পক্ষে প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করা কঠিন। অতীতে অনেক প্রেসিডেন্ট এই অংশকে অসাংবিধানিক দাবি করে তা মানেননি।

Advertisement

ট্রাম্প কি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন পাবেন?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেস থেকে অনুমোদন পাওয়া অনিশ্চিত। কারণ, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র বিভাজন রয়েছে। ১৫ এপ্রিল সিনেটে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার একটি দ্বিদলীয় প্রস্তাব ৫২-৪৭ ভোটে বাতিল হয়।

আবার মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি রিপাবলিকান পার্টি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে না পারে, তবে নিজের লক্ষ্য পূরণে ট্রাম্প বাধাগ্রস্ত হতে পারেন। এমনকি তাঁকে কংগ্রেসের তদন্তের মুখেও পড়তে হতে পারে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, প্রতি সপ্তাহে বিলিয়ন বা শত কোটি ডলার খরচ হওয়া এই যুদ্ধে আমাদের রিপাবলিকান নেতৃত্ব কোনো তদারকি করছে না। এটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে প্রেসিডেন্টের কাজে বাধা দেননি। তবে অনেকেই বলেছেন, এরপর অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস বলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপ সমর্থন করি। কিন্তু ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সমর্থন করবো না।

একই সুর শোনা গেছে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ডন বেকনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী আমাদের হয় অনুমোদন দিতে হবে, নয়তো অভিযান বন্ধ করতে হবে।

এদিকে কিছু রিপাবলিকান নেতা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, যা সামগ্রিক অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমিয়ে দিচ্ছে।

যুদ্ধ কি সত্যিই থেমেছে?

৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও এবং পরে ট্রাম্প একতরফাভাবে তা বাড়ালেও বাস্তবে সামরিক চাপ অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে সমুদ্রপথে। ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব বন্দর অবরোধ করে রেখেছে। এর মধ্যেই সোমবার (২০ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের পতাকাবাহী একটি জাহাজ আটক করে। ট্রাম্প দাবি করেন, জাহাজটি নির্দেশ অমান্য করেছিল।

এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে দুটি বিদেশি জাহাজ আটক করে নিজেদের উপকূলে নিয়ে যায়। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার জলসীমায় অন্তত তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে।

ট্রাম্প কি সময়সীমা পেরিয়ে যুদ্ধ চালাবেন?

মার্কিন অধ্যাপক সালার মোহানদেসি বলেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য খারাপ প্রমাণিত হয়েছে। জনমত এর বিরুদ্ধে, তবুও তিনি কোনো না কোনোভাবে এটি চালিয়ে যেতে পারেন।

তিনি বলেন, ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে চান। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে ভালো চুক্তি করবেন ও যুদ্ধে জড়াবেন না। এখন তিনি চাপে আছেন।

সালার মোহানদেসির মতে, তিনি চাইলে এখনই সরে দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু তা পরাজয় স্বীকারের মতো হবে। তিনি ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন, তাই যুদ্ধ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

কংগ্রেসকে এড়িয়ে যাওয়ার পথ কী?

সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন আইন প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দেয়। ২০০১ সালে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের জন্য এবং ২০০২ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য এই অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রশাসন এটি ব্যবহার করে নানা সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে বাগদাদে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিতে এই আইনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এই অনুমোদন ব্যবহার করেছিলেন।

অতীতে প্রেসিডেন্টরা কীভাবে আইন এড়িয়েছেন?

১৯৭৩ সালের পর থেকে বহু প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ১৯৯০-এর দশকে ইরাক, সোমালিয়া ও যুগোস্লাভিয়ায় অভিযান চালান। ১৯৯৯ সালে তিনি কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই যুগোস্লাভিয়ায় সামরিক অভিযান চালান, যা ৭৯ দিন স্থায়ী হয়। একইভাবে ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক অভিযানের সময় ওবামা প্রশাসন দাবি করে, এটি ‘যুদ্ধ’ নয়, তাই কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন নেই।

সব মিলিয়ে, আইনি ও রাজনৈতিক এই জটিলতার মধ্যে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে যে- কংগ্রেসের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প হয়তো ইরান যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হবেন কিংবা অন্য কোনো পথ খুঁজে সংঘাত চালিয়ে যাবেন।

সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন

এসএএইচ