যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা গত এক দশকে যতটা মেরুকৃত হয়েছে, ততটাই বেড়েছে সহিংসতার আশঙ্কা। সম্প্রতি Washington, D.C.-এ অনুষ্ঠিত সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের ঐতিহ্যবাহী ডিনারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া গুলিবর্ষণের ঘটনা সেই অস্থির বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। হামলাকারী ৩১ বছর বয়সী কোল অ্যালেন হামলার মাত্র কয়েক মিনিট আগে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো এক ইশতেহারে নিজেকে “ফ্রেন্ডলি ফেডারেল অ্যাসাসিন” হিসেবে পরিচয় দেন—যা ঘটনাটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাবাহী সহিংসতার ইঙ্গিত হিসেবে সামনে আনে।
Advertisement
ঘটনাটি ঘটে এক প্রেস গালার সময়, যেখানে হোটেলের বাইরে গুলি চালানো হয়। বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও, হামলার পরপরই এক আত্মীয় পুলিশের কাছে অ্যালেনের ইশতেহার হস্তান্তর করেন। পরে New York Post-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর ইশতেহারে তিনি লিখেছেন, ‘অন্য গাল বাড়িয়ে দেওয়া তখনই প্রযোজ্য, যখন তুমি নিজেই নিপীড়িত। আমি সেই ব্যক্তি নই, যাকে বন্দিশিবিরে ধর্ষণ করা হয়েছে—অন্য কেউ নিপীড়িত হলে চুপ থাকা খ্রিস্টীয় আচরণ নয়, এটি নিপীড়কের অপরাধে অংশ নেওয়া।’ অর্থাৎ তাঁর ক্ষোভের প্রকাশ থেকে বোঝা যায়, হামলাকারী নিজের কর্মকাণ্ডকে নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরবতা অপরাধে অংশ নেওয়ার সমান—এই ধারণাই ছিল তাঁর সহিংসতার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু।
অ্যালেন দাবি করেন, হতাহত কমাতে তিনি অস্ত্র ব্যবহারে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে যে ভাষা ব্যবহার করেন, তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিপজ্জনক প্রবণতাকে স্পষ্ট করে। তাঁর লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উল্লেখ ছিল, যদিও Kash Patel-কে তিনি বাদ দেন। এই বাছাই নিজেই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের একটি দিক নির্দেশ করে—যেখানে ব্যক্তি নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী শত্রু নির্ধারণ করে।
ঘটনার পর তদন্ত শুরু করে Federal Bureau of Investigation, যারা এটিকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা” হিসেবে বিবেচনা করছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত একক কোনো কারণের ফল নয়; বরং অনলাইন উগ্রপন্থা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরম রাজনৈতিক ভাষ্যের সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করে।
Advertisement
এই হামলাকে বোঝার জন্য প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই ডিনার মার্কিন রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সেলিব্রিটিদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীকেও পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ভিন্নমতকে শুধু প্রতিপক্ষ নয়, কখনো কখনো শত্রু হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গণতন্ত্রের শক্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন ঘৃণা ও সহিংসতার ভাষ্যে রূপ নেয়, তখন সমাজের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে—কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে অনলাইন উগ্রপন্থা ও রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা করা যায়?
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দেশের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্ট Donald Trump-কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বিশেষত হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালেও ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘আমরা এমন একজন পোপকে পছন্দ করি না যিনি ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকাকে ঠিক মনে করেন।’
ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মন্তব্য ভ্যাটিকান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই মতবিরোধ, অন্যদিকে তাঁর জনপ্রিয়তা ধস নামা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, সহিংসতার ঘটনাকে কখনো কখনো রাজনৈতিক সমর্থন পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে।
Advertisement
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রতীকী বার্তা। কোল অ্যালেন কাউকে হত্যা করতে পারেননি—এটি সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু তাঁর ইশতেহার একটি গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত দেয়: যখন রাজনৈতিক ভাষ্য এতটাই চরমে পৌঁছে যায় যে প্রতিপক্ষকে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখানো হয়, তখন সহিংসতা ন্যায্যতার মুখোশ পায়। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
আজকের ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো রাজনৈতিক মতামত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। একইসঙ্গে এগুলো উগ্র মতাদর্শ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অ্যালেনের ইশতেহার সেই অনলাইন উগ্রপন্থার প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে নৈতিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সহিংসতার যৌক্তিকতা তৈরি করা হয়।
গণতন্ত্রের শক্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন ঘৃণা ও সহিংসতার ভাষ্যে রূপ নেয়, তখন সমাজের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে—কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে অনলাইন উগ্রপন্থা ও রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা করা যায়?
ওয়াশিংটনের এই রাত হয়তো বড় কোনো রক্তক্ষয়ী ঘটনার সাক্ষী হয়নি। কিন্তু এটি এমন এক সংকেত দিয়েছে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ সহিংসতার আগুন কখনো হঠাৎ জ্বলে ওঠে না; তার আগেই তৈরি হয় ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং বিভাজনের দীর্ঘ ছায়া।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/এমএস