ঈদ মানেই অনাবিল আনন্দ, আর এই আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ শৈশব-কৈশোরের অমলিন সব স্মৃতি। বর্তমানের যান্ত্রিক ব্যস্ততায় উৎসবের ধরন পাল্টালেও স্মৃতির পাতায় সেই রঙিন দিনগুলো আজও উজ্জ্বল। আপনজনদের সঙ্গে কাটানো সেই অকৃত্রিম মুহূর্ত আর উৎসবের অন্তর্নিহিত আবেগ নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের সেই স্মৃতিচারণ শ্রুতিলিপি করেছেন আমানুর রহমান-
Advertisement
ঈদ মানেই উৎসবের উচ্ছ্বাস, যার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে শৈশবের সোনালি দিন। তখন ঈদের সকাল পূর্ণতা পেত বড়দের কাছ থেকে পাওয়া সালামি পেয়ে। টাকার অঙ্ক সেখানে তুচ্ছ ছিল, বরং প্রাপ্তির মাঝেই লুকিয়ে ছিল নির্মল সুখ। সেই সময়ের আরেক মধুর অনুষঙ্গ ছিল ঈদকার্ড বিনিময়। ৫ বা ১০ টাকায় কেনা সেই ছোট্ট কার্ডগুলোর আবেদন ছিল অমূল্য, যা আপনজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। চাঁদরাতে দল বেঁধে আনন্দমিছিল আর নানারকম স্লোগানে মুখরিত হতো চারপাশ।
সেদিন পড়ার কোনো চাপ থাকত না, তাই সবাই মিলে মেতে উঠতাম লুকোচুরি, কানামাছি বা গোল্লাছুটের মতো গ্রামীণ খেলায়। পুরো বাড়িজুড়ে বিরাজ করত অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ। এর পাশাপাশি নতুন জামা লুকিয়ে রাখার এক মিষ্টি প্রতিযোগিতা চলত। নিজেরটা কেউ দেখে ফেললে মনে হতো ঈদের আনন্দই ফিকে হয়ে গেল, অথচ অন্যের জামা দেখতে পাওয়ার মাঝে ছিল সীমাহীন রোমাঞ্চ! আজ যান্ত্রিক ও ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততায় শৈশবের সেই অকৃত্রিম উৎসবের আমেজ অনেকটা হারিয়ে গেলেও, স্মৃতির ক্যানভাসে তা আজও জীবন্ত।
স্মৃতির আঙিনায় ঈদুল আজহা সোমনা আক্তারশিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজারশৈশব ও কৈশোরের ঈদুল আজহা যেন স্মৃতির পাতায় আঁকা এক রঙিন ক্যানভাস। বর্তমানে যান্ত্রিকতার ভিড়ে সেই দিনগুলো আজও মনকে আলোড়িত করে। তখনকার ঈদের আনন্দ শুরু হতো হাটের ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে কোরবানির পশু বাড়ি আসার মধ্য দিয়ে। পশুর গলায় রঙিন মালা পরানো, নিজ হাতে ঘাস খাওয়ানো আর সারা দিন তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানোর মাঝে জন্ম নিত এক অদ্ভুত মায়া।
Advertisement
ঈদের সকালে সবাই ঈদগাহে ছুটলে রান্নাঘর হয়ে উঠত উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। পিঠা-পায়েসের মিষ্টি সুবাসের সঙ্গে মসলায় কষানো মাংসের ঘ্রাণ মিলেমিশে এক অপূর্ব আবেশ ছড়াত পুরো বাড়িতে। বিকেলে নতুন পোশাকে বন্ধুদের উচ্ছল আড্ডা কিংবা রাতের বেলা খোলা উঠোনে বসে স্বজনদের সঙ্গে মাংস খাওয়ার আসরগুলো আজও ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল। সময়ের স্রোতে উৎসবের ধরনে আজ হয়তো কৃত্রিমতার ছাপ লেগেছে, কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় অম্লান সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঈদ মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সৌহার্দ্য, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অকৃত্রিম মিলনমেলা।
বড় মেয়ের রঙিন ঈদ স্মৃতি মাহজাবীন তাসনীম রুহীশিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেটঈদুল আজহা মানেই ত্যাগের মহিমা আর নাড়ির টানে নীড়ে ফেরার আকুলতা। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় ঈদের আনন্দ আমার কাছে দায়িত্ব ও সৌহার্দ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন। ছকে বাঁধা পূর্বপরিকল্পনাগুলোই এবার কীভাবে যেন রঙিন স্মৃতিতে পরিণত হয়েছিল! ঈদের সকালে মায়ের সহায়ক হয়ে ঘর গোছানো আর রান্নার মসলা প্রস্তুত করার মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হয়। সচরাচর রান্না না করলেও সেদিন শখ করে ঐতিহ্যবাহী ঝাল রেজালা রেঁধেছিলাম। পরম মমতায় রেঁধে বাবা ও চাচাদের পরিবেশনের পর তাদের তৃপ্তিময় প্রশংসাই ছিল শ্রেষ্ঠ উপহার।
এরপর মাংস বণ্টন করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মানবিক তৃপ্তিটাও ছিল অন্যরকম। বিকেলে সবার সঙ্গে মচমচে নকশিপিঠা তৈরি, অনুজদের সালামি দেওয়া আর আনন্দঘন সেলফিতে মেতে ওঠা সবই আজ স্মৃতিতে অমলিন। পড়াশোনার যাবতীয় ক্লান্তি ভুলে মায়ের স্নেহ আর বাবার সঙ্গে মধুর খুনসুটিতে মোড়ানো এই অনিন্দ্যসুন্দর সময়গুলোই আমার এবারের ঈদকে করেছে সার্থক ও স্মৃতিময়।
আরও পড়ুনসীমানার ওপারে ঈদ: কেমন কাটে প্রবাসী তরুণদের ঈদুল আজহায় কোরবানির সঙ্গে থাকুক পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতিশ্রুতিকেএসকে
Advertisement