অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ নামিয়ে আনা বাস্তবসম্মত নাকি প্রতিশ্রুতি?

মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণেই দীর্ঘদিন ধরে অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্রকৃত মজুরি না বাড়লেও মূল্যস্ফীতি থেমে নেই, বরং বেড়েই চলেছে।

Advertisement

জীবনযাপনের ব্যয় মিটাতে হিমসিম খাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ। এমন সময় এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর কথা সবার। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবাই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন এটা কি আদৌ সম্ভব?

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশ কমাতে হবে।

Advertisement

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সরকারের পক্ষে নয়। তাদের মতে, সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও পড়ুন মূল্যস্ফীতির লাগাম ৭.৫ শতাংশে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং বিভিন্ন সেবার মূল্যে প্রতিফলিত হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিবর্তে তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার নিয়ে চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামাও দেশের মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে। এসব কারণে কেবল অভ্যন্তরীণ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে না বলে মনে করছেন তারা।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্য অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।

Advertisement

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সংকোচনমূলক (কন্ট্র্যাকশনারি) মুদ্রানীতি আরও কিছু সময় অব্যাহত রাখার প্রয়োজন হতে পারে।’

ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে না পারে, তবে তা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, সত্যি বলতে, প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য নানা ধরনের নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যা একদিকে রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পকেও সুরক্ষা দেবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং অর্জন করা কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

আরও পড়ুন ‘বাজেট-জিডিপি বুঝি না, জিনিসপত্রের দাম কমুক’

তিনি জানান, সরকার সম্প্রতি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করবে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর পাশাপাশি, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকা লোকজন নানাভাবে চাঁদাবাজি করছে যা ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়াচ্ছে।

সরকার যদি সড়কপথে চাঁদাবাজি এবং কাঁচাবাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে, বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন।

এদিকে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক খুচরা ব্যবসায়ী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, পাইকারদের কাছ থেকে সবজিবাহী প্রতিটি ট্রাক গ্রহণের সময় তাদের অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়, যা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যায়।

তার অভিযোগ, ঢাকায় আসার পথে পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোকে বিভিন্ন স্থানে অর্থ দিতে হয়, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য, পাশাপাশি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য—এসবই বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের বাস্তব স্বীকৃতি দেয়। বিশেষ করে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি নির্ভরতা এবং জ্বালানি ও সারসহ বৈশ্বিক মূল্যচাপকে বাজেটে স্বীকার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, বলে মনে করেন তিনি।

তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ঠিক করতে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে পদক্ষেপ থাকতে হবে।

মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকা অবস্থায় এক বছরের মধ্যে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও এর জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হচ্ছে বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।

আরও পড়ুন নতুন অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাজেটে ১০ অগ্রাধিকার 

ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদহার ও আমদানি ব্যয়ের চাপ উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে তুলবে। এর ফলে পণ্যের বাজারমূল্য কমার পরিবর্তে বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজার তদারকি জোরদার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে এসব পদক্ষেপের সুফল পেতে সময় লাগবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

আরও পড়ুন কোনোভাবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে পারছে না সরকার

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রোধ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—সরকার কি সত্যিই মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবে, নাকি এই লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত কেবল বাজেটের একটি আশাবাদী প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাবে?

আরও পড়ুন নতুন সরকারের বাজেট: স্বস্তির বার্তা নাকি কঠিন সমীকরণ? মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক চিত্র

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল এবং বছরজুড়ে তা দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করেছে। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু হলেও বছরের শেষভাগে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা পুরো সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এরপর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তা দ্রুত কমে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে। তবে অক্টোবর থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী ধারা শুরু হয় এবং নভেম্বরে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে পৌঁছে বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। ফেব্রুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায় এবং মে মাসে তা ৯ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকলেও শেষ দিকে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১১ শতাংশ পয়েন্ট কম। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি আরও কমে অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে পৌঁছায়, যা এ অর্থবছরের সর্বনিম্ন। এরপর ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতে তা ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠলেও মার্চে সামান্য কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামে। তবে এপ্রিল ও মে মাসে আবার বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৯ দশমিক ০৩ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়।

আরও পড়ুন বাজেটের রূপরেখা / মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জীবনমান উন্নয়নে জোর

দুই বছরের ব্যবধানে মে মাসে সবচেয়ে কমে আসে; ২০২৪-২৫ সালে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ, আর ২০২৫-২৬ সালে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি বছরের শেষদিকে মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা ধরে রাখা যায়নি। এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি পুরো সময়জুড়েই নিচে অবস্থান করলেও এপ্রিল ও মে মাসে তা পুনরায় ৯ শতাংশের ওপরে উঠে এসেছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আইএইচও/এমএমএআর