গরম এলেই শিশুদের নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ এবং উদ্বেগজনক সমস্যা হলো ডায়রিয়া। অতিরিক্ত গরমে খাবার ও পানীয় দ্রুত দূষিত হয়ে যায়, পানির মান খারাপ হতে পারে এবং স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো না মানলে শিশু সহজেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।
Advertisement
বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া দ্রুত পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে, যা কখনও কখনও জীবনঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তাই গরমে শিশুকে ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখতে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন গরমে নবজাতকের যত্ন নেবেন যেভাবে কেন গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে?গরম আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে খাবার ও পানীয় সহজেই দূষিত হয়ে যায়। শিশুরা বাইরে খেলাধুলা করে, হাত-মুখ পরিষ্কার না করেই খাবার খায় বা অপরিষ্কার পানি পান করে। এসব কারণেই ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া রাস্তার খোলা খাবার, কাটা ফল, অপরিষ্কার বরফ ও দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবারও ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।
শিশুকে নিরাপদ পানি পান করান শিশুকে সবসময় ফুটিয়ে ঠান্ডা করা অথবা নিরাপদ ফিল্টার করা পানি পান করান। বাইরে গেলে সঙ্গে নিরাপদ পানির বোতল রাখুন। পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন। সন্দেহজনক উৎসের পানি শিশুকে পান করাবেন না। হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। আরও পড়ুন স্তন ক্যানসার / নতুন পরীক্ষায় কেমোথেরাপি ছাড়াই মিলতে পারে মুক্তি শিশুকে শেখান খাবার খাওয়ার আগে হাত ধুতে। টয়লেট ব্যবহারের পরে হাত ধুতে। বাইরে থেকে বাসায় ফিরে হাত পরিষ্কার করতে (সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া উচিত) খাবারের বিষয়ে সতর্ক থাকুন সদ্য রান্না করা খাবার খাওয়ান। দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার শিশুকে দেবেন না। বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন। কাটা ফল দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় রাখবেন না। ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে ব্যবহার করুন। আরও পড়ুন গরমে কাঁঠাল খাওয়ার আগে যা জানা জরুরি রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলুনরাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া অনেক খাবার খোলা অবস্থায় থাকে এবং ধুলাবালি ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। বিশেষ করে ফুচকা, চটপটি, শরবত, আইসক্রিম ও কাটা ফল। এসব খাবার শিশুকে খাওয়ানোর আগে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
Advertisement
ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধই সবচেয়ে নিরাপদ খাবার। বুকের দুধে এমন অনেক উপাদান থাকে, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। গরমের সময়ও শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
শিশুর খাবার তৈরির সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখুনফিডার, বাটি, চামচ বা বোতল ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। প্রতিবার ব্যবহারের আগে ও পরে পরিষ্কার করুন। সম্ভব হলে গরম পানিতে জীবাণুমুক্ত করুন। শিশুর খাবারের পাত্র অন্যদের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার না করাই ভালো। শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দিন, কারণ গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাই শিশুকে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। নিরাপদ পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত (পরিষ্কার পানি দিয়ে তৈরি) ঘরে তৈরি তরল খাবার-এসব শিশুর শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন স্ট্রোকের আগে শরীর যেসব সতর্ক সংকেত দেয় ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?শিশুর ডায়রিয়া শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এসময় ওরস্যালাইন খাওয়ান। বুকের দুধ চালিয়ে যান। পর্যাপ্ত তরল দিন। শিশুকে বিশ্রাম নিতে দিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার দিন।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে খুব বেশি পানিশূন্যতা মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া চোখ বসে যাওয়া প্রস্রাব কমে যাওয়া বারবার বমি হওয়া মলে রক্ত দেখা যাওয়া উচ্চ জ্বর শিশু অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে পড়া অভিভাবকদের জন্য কিছু অতিরিক্ত পরামর্শ শিশুর নখ ছোট রাখুন। খাবার ঢেকে রাখুন। ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। মাছি ও পোকামাকড় থেকে খাবার সুরক্ষিত রাখুন। শিশুর টিকাদান সময়মতো সম্পন্ন করুন, বিশেষ করে রোটাভাইরাস টিকা। আরও পড়ুন গরমেও সর্দি-কাশি-গলাব্যথায় ভুগছেন? জানুন প্রতিকারগরমের সময় শিশুর ডায়রিয়া একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা। তবে সচেতনতা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ডায়রিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অভিভাবকদের সামান্য সতর্কতা শিশুকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মনে রাখতে হবে, ডায়রিয়া হলে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, তাই লক্ষণ দেখা মাত্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
Advertisement
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, সিডিসি, আইসিডিডিআরবি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য ও নির্দেশনা
জেএস/