লাইফস্টাইল

১০ মিনিটের ভালো কাজ

পৃথিবী সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ৩৬৫ দিন। একটি গাড়ি সাধারণত ঘণ্টায় যেতে পারে ৬০ কিলোমিটার আর মহাকাশযান ঘণ্টায় যায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার! মানবসমাজের গতি কিন্তু আরো বেশি, মানবিক গতি। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেই আদিযুগ থেকেই। এটাই মানুষের মানবিক স্বভাব। এজন্যেই মানুষের মাঝে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্ব বিরাজ করে।

Advertisement

তবে মানুষ যেমন মানবিক, তেমনি ভুলোমনাও। না হলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এত এত অগ্রগতির পর এখনও কেন একজন মুমূর্ষ রোগীকে হাসপাতালে শুয়ে রক্তের অভাবে ছটফট করতে হয়! পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে সক্ষম রক্তদাতার ন্যূনতম অংশগ্রহণেই সারা বিশ্ব থেকে রক্তের চাহিদা নিমিষেই পূরণ করা সম্ভব, সহজেই।

এক প্রসূতি মা, ক্যানসার বা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর নতুন জীবনের জন্য ব্যয় করুন আপনার জীবনের ১০টি মিনিট

একটি সিনেমা দেখতে লাগে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। একটি নাটক শেষ করতে, ধরা যাক, এক ঘণ্টা। কিংবা একটি সিরিজের একটি পর্বের পেছনে সময় ব্যয় হয় ২০ মিনিট। এছাড়া ফেসবুক-ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করা সময়ের হিসেব যার যারটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতে দিতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে মধ্যরাত হয়ে যায়, তারই বা হিসেব রাখে কজন। আর স্বেচ্ছায় এক ব্যাগ রক্ত দিতে সময় লাগে ১০ মিনিট!

Advertisement

প্রেশারের গতিভেদে কারো কারো ক্ষেত্রে এটি ৫-৬ মিনিটেও সম্ভব। রাজধানীর রাস্তায় যানজটে পড়ে কত সময় নষ্ট হয়? এমন ‘সময় না পাওয়া’, ব্যস্ততার দোহাই বা অপচয়ের হিসেব বাদ দিয়ে সক্ষম ব্যক্তি, যারা এখনও স্বেচ্ছা রক্তদানে যুক্ত হতে পারেননি, তারা মাত্র ১০ মিনিট ব্যয় করুন। কোনো এক প্রসূতি মা, ক্যানসার বা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর নতুন জীবনের জন্য ব্যয় করুন আপনার জীবনের ১০টি মিনিট। প্রতি চার মাস পর পর মাত্র ১০ মিনিট। এর থেকে ভালো কাজ, এর থেকে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে? ধর্মীয় বলেন, আধ্যাত্মিক বলেন, মানবিক বলেন কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতা— স্বেচ্ছা রক্তদানকে অবহেলা করার কোনো যুক্তিই আসলে দাঁড় করানো যাবে না।

রক্ত দিলে শারীরিকভাবে মেরুমজ্জার রিজুভিনেশান বা স্টিমুলেশান, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে দ্বিগুনের বেশি

ভাবুন। নিজের ভেতরে ডুব দিন। ১০ মিনিটের ভালো কাজ করাটা শুধু আপনার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে। আর যদি এরই মধ্যে আপনি মানবিক এ কাজে অভ্যস্ত হয়ে যান, তাহলে অন্যকে অনুপ্রাণিত করুন। চলুন ১০ মিনিটের ভালো কাজ সম্পন্ন করি, সামর্থ্যবান সবাই মিলে।

পৃথিবীতে রক্তের অভাবে প্রতি বছর বহু রোগীর প্রাণ সংকটে পড়ে। আমাদের দেশেও তেমনটা ঘটে। কেননা আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় রক্তদাতার সংখ্যা এখনো নগণ্য। দেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে। তরুণদের অংশগ্রহণও দিন দিন বাড়ছে। ১০ মিনিটের মহৎ এই কাজে রক্তদাতা নিজেই পেতে পারেন নানান উপকার। রক্ত দিলে শারীরিকভাবে মেরুমজ্জার রিজুভিনেশান বা স্টিমুলেশান, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে দ্বিগুনের বেশি। এছাড়া ক্ষতিকর কোলেস্টরেল কমা, বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া স্লথ হওয়াসহ নানান শারীরিক উপকার পাওয়া যায়। সামাজিকভাবে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো, রক্ত নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করা, সমাজে ঘাতক রোগের বিস্তার কমানোসহ, সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন বৃদ্ধি করতে রক্তদানের ভূমিকা অপরিসীম। রক্তদানের মাধ্যমে বিনা খরচে ‘ভালো আছি’, এই তৃপ্তি বোধ করতে পারা এবং অপার আনন্দের এক অনুভূতিও উপভোগ করা যায়।

Advertisement

আমাদের দেশে সন্ধানী, কোয়ান্টাম বা রেড ক্রিসেন্টের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মানবিক এ সেবায় নিবেদিত। প্রযুক্তির সহায়তায় নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ, সঞ্চালন এবং মানবিক অংশগ্রহণে একদিন সারা বিশ্বেই রক্তচাহিদা পূরণ হবে, এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে। প্রয়োজন শুধু ১০ মিনিটের ভালো কাজটা অব্যাহত রাখা।আরএমডি