২০২৬ বিশ্বকাপে ‘সি’গ্রুপের ম্যাচে বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৪টায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল মুখোমুখি হবে গত আসরের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোর। ইউরোপের অন্যতম সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওরা এবার বিশ্বকাপ জয়ের উদ্দেশ্যে নিজেদের গ্রুপ পর্বে নিউ জার্সিতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মাঠে নামবে।
Advertisement
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে আজ পর্যন্ত কোনো দেশ বিদেশি কোনো কোচের অধীনে বিশ্বকাপ জেতেনি। ব্রাজিল কি এবার তাদের ইতালিয়ান কোচের অধীনে নতুন করে ইতিহাস লিখতে পারবে?
ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তির প্রাপ্তির ঝুলিটা অন্য যে কোনো কোচের কাছেই ঈর্ষণীয়। ইউরোপের পাঁচটি প্রধান লিগ- স্পেন, ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে শিরোপা জয় করা একমাত্র কোচ তিনি। এছাড়া পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জিতে গড়েছেন অনন্য রেকর্ড, যা তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচদের কাতারে স্থান দিয়েছে।
এবার তার সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল জাতীয় দল ব্রাজিল তাকে দায়িত্ব দিয়েছে আবারও বিশ্বফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে আনার। তবে ব্রাজিল দলের দায়িত্বে আসার পর এই ইতালিয়ান কোচ দলটাকে গুছিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় পেয়েছেন কিনা সেটি নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়।
Advertisement
ব্রাজিলের স্কোয়াডের দিকে তাকালে এক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে যেন সব তারকা ফরোয়ার্ডে ঠাসা একটা দল। কিন্তু ফরোয়ার্ড লাইন থেকে নিচের দিকে আসা হয়, ততই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ব্রাজিল ভক্তদের।
নিয়মিত ব্রাজিলের খেলা অনুসরণ করলে দেখা যায়, আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল সাধারণত ৪-২-৩-১ কিংবা ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলে থাকে।
গোলবারের নিচে লিভারপুলের এলিসন বেকারের পাশাপাশি রয়েছেন ফেনের্বাখের গোলকিপার এডারসন মোয়ারেস। এছাড়া তৃতীয় অপশন হিসেবে রয়েছেন ওয়েভার্টন। খুব সম্ভবত এলিসন বেকারই থাকতে চলেছেন মূল একাদশে।
ডিফেন্স লাইনে ২০২৬ এর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দলের অধিনায়ক মার্কুইনহোস। এছাড়া রয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রানারআপ দলেরই আরেক ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস। এই দুজনই থাকবেন শুরুর একাদশে সেটা একপ্রকার নিশ্চিত। এছাড়া এই দুইজনের বদলি হিসেবে রয়েছেন লিও পেরেইরা, ব্রেমার এবং রজার ইবানেজ।
Advertisement
সেন্টার ব্যাক পজিশনে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার প্রশ্নে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও ভোগাতে পারে তাদের ফুল ব্যাক লাইন। কাফু, রবার্তো কার্লোসের মতো তর্কসাপেক্ষে ইতিহাসের সেরা ফুলব্যাকরা যে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠ মাতিয়েছেন এককালে, সেই দলে এবার যেন তারকা ফুলব্যাকের বড্ড অভাব।
রাইট ব্যাক পজিশনে খুব সম্ভবত দানিলোকে দেখা যাবে শুরুর একাদশে। অন্যদিকে লেফট ব্যাকে দলের শুরুর একাদশে নিয়মিত স্টার্টার ওয়েসলি ইনজুরিতে পড়ায় তাকে রিপ্লেস করতে পারেন অ্যালেক্স স্যান্ড্রো। এছাড়া রাশিয়ান ক্লাব জেনিথের লেফট ব্যাক ডগলাস সান্তোসও হতে পারেন আরও একটি বিকল্প অপশন।
মিডফিল্ডের দিকে তাকালে হোল্ডিং মিডফিল্ডার কিংবা প্রতিপক্ষের থেকে বল কেড়ে নেওয়ার সামর্থ্য আছে এমন মিডফিল্ডার ব্রাজিল দলে রয়েছেন। ডাবল পিভটে জুটি বাঁধতে পারেন প্রিমিয়ার লিগের মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো এবং ব্রুনো গুইমারেস। প্রিমিয়ার লিগের এই দুই মিডফিল্ডারই ক্যারিয়ারে তাদের সেরা ছন্দে না থাকলেও খুব যে বাজে ফর্মে আছেন, সেটিও বলার সুযোগ নেই। এছাড়া তাদের বদলি হিসেবে রয়েছেন ফ্যাবিনহো এবং দানিলো সান্তোস।
ইনজুরিজনিত কারণে খুব সম্ভবত প্রথম ম্যাচে অনুপস্থিত থাকবেন ব্রাজিলের মূল তারকা নেইমার জুনিয়র। তাই নম্বর টেন রোলে দেখা যেতে পারে লুকাস পাকুয়েতাকে। দীর্ঘ একটা সময় বিভিন্ন কোচের অধীনে জাতীয় দলে পারফর্ম করেছেন ২৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপের মঞ্চে নেইমারের অনুপস্থিতিতে তাই তার থেকে ভক্তদের প্রত্যাশাও একটু বেশিই।
অ্যাটাকিং লাইন আপের দিকে তাকালে ব্রাজিলের অ্যাটাক যে কোনো প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বামপাশে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং ডানপাশে রাফিনহার মতো খেলোয়াড় রয়েছেন। ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা এখন এই দুই উইঙ্গার। মাঝমাঠ থেকে যদি ভিনি ও রাফিনহার জন্য সঠিক বল সাপ্লাই নিশ্চিত করা যায়, তবে এই জুটিকে আটকানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। চলতি মৌসুমের ক্লাব পারফরম্যান্সের দিকে তাকালেও সংখ্যাগুলো ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে। চলতি মৌসুমে মাদ্রিদের জার্সিতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৩৬ ম্যাচে করেছেন ১৬ টি গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট। অন্যদিকে বার্সেলোনা তারকা রাফিনহা ২২ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৩টি গোল এবং অ্যাসিস্ট করেছেন ৩টি। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে দুজনকেই পুরো বিশ্বকাপের আসরেই জ্বলে উঠতে হবে যদি তারা শিরোপা জিততে চায়। এছাড়া তাদের বদলি হিসেবে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, লুইজ হেনরিকে এবং রায়ান। সবশেষে নম্বর নাইন রোলে ব্রাজিলের হাতে যে তিনটি অপশন রয়েছে, তারা তিনজনেই ধরতে গেলে ধারাবাহিকভাবে ছন্দে আছেন। প্রিমিয়ার লিগের মাথেউস কুনহা কিংবা ইগর থিয়াগো দুজনেই যথেষ্ট ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করছেন। কুনহা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে চলতি মৌসুমে ৩৩ ম্যাচে করেছেন ১০টি গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট। এদিকে ইগর থিয়াগো ৩৭ ম্যাচে ২২টি গোল এবং ১টি অ্যাসিস্ট।
অন্যদিকে অলিম্পিক লিঁওতে খেলা এন্ড্রিকও রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর যেন নিজেকে অন্যভাবে খুঁজে পেয়েছেন। লিগ ওয়ানে চলতি মৌসুমে ১৬ ম্যাচে করেছেন ৫টি গোল, যেখানে তার অ্যাসিস্ট সংখ্যা ৭। তবে দলের নম্বর নাইন বাছাইয়ে আনচেলত্তি পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেবেন বলেই মনে হচ্ছে।
ব্রাজিলের হেক্সা মিশন নিয়ে অবশ্য অনেকেই এবারের আসরে তাদের ফেভারিট মনে করছেন না। এমনকি তাদের গোলকিপার খোদ এলিসন বেকারও বলেছেন এমন কথা।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও রানার্সআপ ফ্রান্সকে বেশি প্রস্তুত মনে হচ্ছে, এই প্রসঙ্গে টেনে ব্রাজিলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এলিসনকে প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কারও জন্যই কোনো নিশ্চয়তা নয় এবং এটি দলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রথম ম্যাচের আগে দলের অবস্থা কেমন। আমরা প্রস্তুত।’
অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে নেইমারের ফেরার ব্যাপারে কথা বলেছেন কোচ আনচেলত্তি। তিনি বলেন, ‘সে (নেইমার) দ্রুত ফিট হয়ে ফেরার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহে সে পূর্ণাঙ্গ অনুশীলনে ফিরতে পারবে।’
অর্থাৎ নেইমার এখনো পুরোদমে অনুশীলনেও ফিরতে পারেননি। ফলে প্রথম ম্যাচ তো বটেই গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচেও তার খেলা অনিশ্চিত।
নেইমারের ইনজুরি দলকে ভোগাতে পারে হয়তো। তবে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে থাকা এই তারকাকে ছাড়াও ব্রাজিল দল যে খুব বেশি অপরিণত সেটা বলার কোনো সুযোগ নেই। ফলাফল দেখা যাবে মাঠের লড়াইয়ে।
লিখেছেন: মোস্তাকীম আহম্মেদ রাহুল
এমএমএআর