ধর্ম

জীবনের ম্যাচ একটি ফুটবল ম্যাচের মতোই: মুফতি মেন্‌ক

একটি ফুটবল খেলা কত মিনিটের হয়? ৯০ মিনিটের। খেলার শুরুটা কিসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়? সেখানে একজন রেফারি থাকেন। তিনি বাঁশি বাজান। রেফারি যখন বাঁশি বাজান, তখন আপনাদের কাজ কী? আপনারা কিক অফ করেন (খেলা শুরু করেন) এবং বলটিকে লাথি মারতে থাকেন। কোন অভিমুখে বা কোন দিকে লাথি মারেন? প্রতিপক্ষের দিকে, তাই না? অপর প্রান্তে থাকা গোলপোস্টের দিকে। পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে মাঠের প্রত্যেকে অপর প্রান্তের গোলপোস্টটির দিকেই নিজেদের মনোযোগ ধরে রাখে।

Advertisement

মনে করুন, খেলায় আপনারা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে আছেন; আপনারা কি তখন ম্যাচটি থামিয়ে দিতে পারবেন এবং বলতে পারবেন যে, 'ঠিক আছে, আমরা তো জিতে গেছি’? না, পারবেন না। কিংবা ধরুন, আপনারা ৫-০ ব্যবধানে জিতছেন; আপনারা কি খেলার মাঝপথে ম্যাচটি থামিয়ে দিয়ে বলতে পারবেন যে, 'আমাদের খেলা শেষ'? না, বরং খেলাটিকে একদম শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না রেফারি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে ম্যাচটি শেষ। আর খেলা শেষ হলে রেফারি আবারও বাঁশি বাজিয়ে খেলা শেষ করবেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এভাবেই খেলা হয়।

ঠিক একইভাবে, আপনাদের জীবনেও এমন একটি সময় আসবে যখন আপনাদের জীবনের শেষ বাঁশিটি বাজানো হবে। আর যখন সেই শেষ বাঁশি বাজবে, তখনই কেবল চূড়ান্ত স্কোর দেখা যাবে যে স্কোরটি ৩-০ নাকি ৫-১।

আরও পড়ুন মুফতি মেন্‌ক / জীবনসঙ্গীর প্রতারণা ধরে ফেললে কী করবেন?

ম্যাচের শুরুতে যদি আপনারা পিছিয়ে থাকেন এবং প্রতিপক্ষ দল যদি ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে, আর খেলার তখনও ৪৫ মিনিট অর্থাৎ পুরো এক হাফ বাকি থাকে, তবে কি আপনাদের জেতার কোনো সুযোগ আছে? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনারা কত ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন? ৩-০ ব্যবধানে। কিন্তু ম্যাচটি যখন শেষ হবে, ততক্ষণে আপনারা যদি সঠিকভাবে খেলা চালিয়ে যান, তবে আপনারা হয়তো ৪-৩ ব্যবধানে জিতে যাবেন। প্রতিপক্ষের তখনও ৩ গোলই থাকবে, কিন্তু আপনাদের হয়ে যাবে ৪ গোল। এমন ম্যাচ কি বাস্তবে হয় না? এমন ম্যাচ তো অহরহ দেখা যায়, প্রচুর আছে এমন উদাহরণ। খেলার আসল বিজয়ী কে, তা কেবল ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তেই নির্ধারণ করা যায়। আর মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে সংশোধনের জন্য কিছুটা বাড়তি সময়ও দিয়ে থাকেন।

Advertisement

যখন জীবনের ম্যাচ শুরু হয়, তখন আপনারা কী করেন? আপনাদের পুরো জীবন জুড়ে একটি নির্দিষ্ট গোলপোস্ট বা লক্ষ্য থাকে। শয়তান একদিক থেকে ধেয়ে আসে আর আপনারা এগিয়ে যান অন্যদিক দিয়ে। আপনাদের একের পর এক গোল করতে হবে। জীবনের সেই গোলগুলো কী কী?

আপনাদের নামাজ হলো একটি গোল, মাশাআল্লাহ ১-০! আজ সকালে আমি ফজরের নামাজ পড়েছি, তার মানে স্কোর ১-০। ভালো কাজগুলো হলো একেকটি গোল। আপনাদের কোরআন তিলওয়াত করা একটি গোল। আর কী কী গোল হতে পারে? রোজা রাখা একটি গোল, জাকাত দেওয়া একটি গোল, হজে যাওয়া একটি গোল, মানুষের প্রতি দয়াশীল হওয়া একটি গোল এবং সব ধরনের গুনাহ বা পাপকাজ থেকে দূরে থাকাও একেকটি গোল।

এই চলার পথে শয়তানও মাঝে মাঝে কিছু গোল দিয়ে বসবে অর্থাৎ আপনার দ্বারা ভুল-ত্রুটি, গুনাহ করিয়ে নেবে। কিন্তু শয়তানের দেওয়া গোল নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না; আপনাদের জীবনের শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আপনারা নিজেদের খেলাটি চালিয়ে যান। এই বাঁশি ৮০ বছর বয়সে বাজতে পারে, ৯০ বছর বয়সে বাজতে পারে, ৪৫ বছর কিংবা ৬০ বছর বয়সেও বাজতে পারে—যখনই হোক, জীবনের শেষ বাঁশিটি যখনই বাজবে, তখনই আপনারা আল্লাহর মুখোমুখি হবেন। তিনি আপনাদের আমলনামা বা ফলাফল আপনাদের হাতে তুলে দেবেন। এবং তিনি বলবেন—'সাবাশ! তুমি তোমার সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ, এখন তুমি বিশ্বকাপ গ্রহণ করতে পারো।' আমাদের জীবনের ক্ষেত্রে সেই 'বিশ্বকাপ' বা চূড়ান্ত ট্রফিটি আসলে কী? সেটি হলো 'জান্নাতুল ফিরদাউস'।

আরও পড়ুন আল্লাহর রহমতের আশা হারাবেন না: মুফতি মেনক

এই দুনিয়ার বাস্তবতা এবং এখান থেকে বিদায় নেওয়ার বিষয়টি হুবহু একটি ফুটবল ম্যাচের মতোই, যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনাকে কেবল অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। চেষ্টা চালিয়ে যান, কখনোই থামবেন না।

Advertisement

কোনো একদিন যদি শয়তান আপনাকে ধোঁকা দিয়ে কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ করিয়েও ফেলে, যে কারণে মনে হতে পারে শয়তান এখন ২-০ ব্যবধানে জিতে যাচ্ছে; কিন্তু সেটাই তো ম্যাচের শেষ নয়, তাই না? আমি আবারও উঠে দাঁড়াব এবং এবার আমি একাই ৫টি গোল করব; ফলে ম্যাচের শেষে আমাদের স্কোর দাঁড়াবে ৫-২।

তাই প্রতিদিন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন, 'আজকে আমি ভালো কী কাজ করেছি?'

একটি বিষয় খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখবেন—কোনো 'ওন গোল' দিয়ে অর্থাৎ নিজেদের পোস্টে নিজে গোল দিয়ে করে যেন আপনাদের এত কষ্ট করে জেতা স্কোরটি হারিয়ে না ফেলেন। জীবনের খেলায় ওন গোল কী? জীবনের খেলায় ওন গোল হলো, অন্যের নামে গিবত বা পরনিন্দা করা, চোগলখোরি করা, মানুষের ক্ষতি করা, কাউকে ধোঁকা দেওয়া কিংবা প্রতারণা করা—এগুলো যখন করেন, তখন আপনারা মূলত নিজেদের উপার্জিত নেক আমল বা ভালো কাজগুলো অপরকে বিলিয়ে দিতে থাকেন। 

ওন গোল ও শয়তানের গোলগুলো না চিনলে এসব ব্যাপারে সচেতন না হলে আমরা জীবনে আসল সাফল্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারব না।

লেখক: ডক্টর মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেন্‌ক, যিনি মুফতি মেন্‌ক নামে বেশি পরিচিত, একজন মুসলিম শিক্ষাবিদ, ইসলাম প্রচারক ও বক্তা। তিনি বর্তমানে জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি। ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৭ সালে জর্ডানের রয়্যাল আল আল-বাইত ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক থট তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ মুসলমানের অন্যতম হিসাবে ঘোষণা করে।

সূত্র: লেখাটি মুফতি মেন্‌কের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার "The Euro 2020 can be used as an example of life!!" শীর্ষক বক্তব্য অবলম্বনে রচিত।

ওএফএফ