দেশের এক সময়ের দাপুটে আইজিপি বেনজীর আহমেদ এখন পলাতক আসামি হিসেবে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আসামি করা হয়েছে।
Advertisement
এর মধ্যে আসামি হিসেবে একটি মামলায় বিচার কার্যক্রম এরইমধ্যে শুরু হয়েছে, অন্যটি এখনও তদন্তাধীন। উভয় মামলাই দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পুলিশের আলোচিত এই মহাপরিদর্শক (আইজিপি)।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। সেই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। বেনজীর আহমেদ মামলার অন্যতম আসামি।
মামলাটিতে এরইমধ্যে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর আদালত পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে, যার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন, যারা সেনাবাহিনীর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা। বেনজীর আহমেদসহ বাকি আসামিদের পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।
Advertisement
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখন প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তও চলছে। আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই মামলাতেও বেনজীর আহমেদ অন্যতম আসামি।
প্রসিকিউশনের সূত্রগুলো বলছে, শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন। মামলাটিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হবে বলে প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তুলে ধরে জাগো নিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের সময় তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীরের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় এসেছে এবং তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িয়েছেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
Advertisement
আমিনুল ইসলাম বলেন, শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনাটি গোটা পৃথিবীর মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেন, তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের পরিচয় বা পেশা বিবেচনা না করেই আইনের আওতায় আনা হবে।
সিভিলিয়ান হোন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, বলেন তিনি।
শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে অভিযোগ জমা দেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। তিনি সংগঠনের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে অভিযোগটি দাখিল করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে ২১ জনকে আসামি করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলো দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রেই রয়েছেন বেনজীর আহমেদ, যার বিরুদ্ধে বিচার ও তদন্ত এখন সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে।
এফএইচ/এসএনআর