প্রবাস

বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের নেতৃত্বের এক অনিবার্য প্রশ্ন

ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুধু একজন অর্থনীতিবিদ নন, তিনি একটি ধারণা, একটি আন্দোলন এবং লক্ষ মানুষের জীবনের নতুন শুরু। এমন এক সময়ে, যখন দারিদ্র্যকে ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নেওয়া হতো, তখন একজন মানুষ প্রশ্ন করেছিলেন, “গরিবরা কেন ঋণ পাবে না?”

Advertisement

সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় গ্রামীণ ব্যাংক, আর সেখান থেকেই শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তনের একটি অধ্যায়।

ড. ইউনূস দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সিস্টেমের ত্রুটি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ সুযোগ পেলে নিজেই নিজের জীবন বদলে নিতে পারে। ব্যাংকের দরজা যখন গরিব মানুষের জন্য বন্ধ ছিল, তখন তিনি সেই দরজাই নতুন করে তৈরি করেন, জামানত ছাড়াই, বিশ্বাসের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের ছোট ছোট গ্রাম থেকে শুরু করে আজ তার চিন্তা পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া এই মানুষটি কখনো নিজেকে নায়ক মনে করেননি। বরং বারবার বলেছেন, প্রকৃত নায়ক সেই মানুষগুলো, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের জীবন বদলে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছে।

Advertisement

এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়। এটি সম্ভাবনার গল্প। এটি প্রমাণ করে যে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে মানুষকে এমনভাবে ক্ষমতায়িত করা, যেন তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।

আজকের বিশ্ব এবং জাতিসংঘের সংকট

বর্তমান বিশ্ব এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শরণার্থী সংকট এবং নৈতিক নেতৃত্বের ঘাটতি মানবসভ্যতাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন। বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল, তারা কি এখনো তাদের মূল দায়িত্ব পালন করতে পারছে?

জাতিসংঘ, একসময় যা মানবতার সর্বোচ্চ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তহীনতা, ভেটো রাজনীতি এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থসংঘাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

Advertisement

ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা, গাজা সংকটে বিভক্ত আন্তর্জাতিক অবস্থান, সুদান ও মিয়ানমারের মানবিক বিপর্যয়ে সীমিত কার্যকারিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান জাতিসংঘের বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে।

ফলে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। জাতিসংঘকে যদি তার নৈতিক ও কার্যকর অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে কেমন নেতৃত্ব প্রয়োজন?

নেতৃত্ব সংকট: প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা

আজকের বিশ্বে নেতৃত্বের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আর কেবল কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যথেষ্ট নয়।বিশ্ব আজ এমন একজন নেতার সন্ধান করছে, যিনি ক্ষমতার ভাষার চেয়ে আস্থার ভাষা বেশি বোঝেন।

প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তিত্বের, যিনি রাষ্ট্রের গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে পারেন, মানুষের ভেতরের সংকট বুঝতে পারেন, সংঘাতরত পক্ষগুলোর সঙ্গে সংলাপ চালাতে পারেন এবং বৈশ্বিক আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারেন।

জাতিসংঘের মহাসচিবের পদে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরপেক্ষতা, নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, উন্নয়ন ও মানবিক সংকট সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেতুবন্ধন তৈরির সক্ষমতা।এই জায়গাতেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসে।

ড. ইউনূসের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বাস্তব প্রভাব

ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা শুধুমাত্র একটি দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একদিকে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে কাজ করেছেন, অন্যদিকে বিশ্বের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী এবং সামাজিক উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উন্নয়ন ও মানবিক অগ্রগতির প্রশ্নে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি তিনি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কমিশন, ফোরাম এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ব্যবসা নিয়ে তার কাজ তাকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

তার Three Zero ধারণা, অর্থাৎ শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নির্গমন, কেবল একটি তাত্ত্বিক দর্শন নয়। এটি এমন একটি রূপরেখা, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে চায়।

এই ধরনের চিন্তা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাকে নতুন মাত্রা দেয়।

তিনি রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি নন, কিন্তু তার রয়েছে নৈতিক শক্তি। তিনি সামরিক শক্তির অংশ নন, কিন্তু তার রয়েছে সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি, কিন্তু মানুষের জীবন পরিবর্তনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ড. ইউনূসের মতো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সমন্বয় খুব কম ব্যক্তির মধ্যেই দেখা যায়। জাতিসংঘের জন্য ইউনূস কেন একটি কাঠামোগতভাবে উপযুক্ত নির্বাচন

জাতিসংঘ এখন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি নৈতিক প্রতীকও। কিন্তু আজ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন একজন নেতা, যিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলতে পারেন এবং যাকে বিভিন্ন পক্ষ অন্তত শুনতে আগ্রহী হবে।

ড. ইউনূস সেই বিরল শ্রেণির ব্যক্তি, যিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটি মানবিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তার পরিচয় কোনো রাষ্ট্র, দল বা ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে নয়; বরং মানুষের ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

এ কারণেই তার নেতৃত্বের সম্ভাবনা কেবল প্রতীকী নয়, বরং কাঠামোগতভাবেও বিবেচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের দ্বৈত বাস্তবতা

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ড. ইউনূসকে ঘিরে মূল্যায়ন সবসময় একরৈখিক ছিল না। একদিকে রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক অর্জন নিয়ে গর্ব, অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ভিন্নমত।

তবে ইতিহাসের একটি বাস্তবতা হলো, বড় পরিবর্তনকারী ব্যক্তিত্বরা প্রায়ই নিজ দেশে বিতর্কিত হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক স্বীকৃতি পান। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা আংশিকভাবে দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি কেবল একজন নোবেল বিজয়ী নন। তিনি একজন নৈতিক কণ্ঠস্বর, যিনি উন্নয়ন, মানবিকতা এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শ্রম, প্রবাসী আয়, উন্নয়ন অগ্রগতি এবং মানবসম্পদ দিয়ে বিশ্বে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশির সম্ভাব্য উপস্থিতি দেশের জন্য এক নতুন ধরনের মর্যাদা, কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘ নেতৃত্বের বাস্তব প্রশ্ন

এখন প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে ড. ইউনূস যোগ্য কি না। প্রশ্নটি আরও বড়। বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কি প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামো যথেষ্ট? যদি উত্তর না হয়, তাহলে বিকল্প কোথায়? বিশ্ব কি এমন একজন নেতার প্রয়োজন অনুভব করছে, যিনি রাষ্ট্রের সীমা ছাড়িয়ে মানবতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আলোচনায় আসে।

ব্যক্তি নয়, প্রয়োজনের প্রশ্ন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে ভাবা কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের বিষয় নয়। এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত প্রশ্ন।

বিশ্ব আজ যে সংকটের মুখোমুখি, সেখানে নেতৃত্বের সংকটই সম্ভবত সবচেয়ে গভীর সংকট। প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সম্পদ রয়েছে, প্রযুক্তি রয়েছে, কিন্তু আস্থার ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।

আর সেই কারণেই বিশ্ব এমন নেতৃত্বের সন্ধান করছে, যিনি ক্ষমতার প্রতিনিধি নন, বরং আস্থার প্রতীক। ড. ইউনূস সেই বিরল ব্যতিক্রম, যিনি এই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

তিনি একমাত্র ব্যক্তি কি না, সেটি বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তার মতো নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।

পৃথিবী যখন নতুন ধরনের নেতৃত্বের সন্ধান করছে, তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে আলোচনা কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগ নয়। বরং এটি এমন এক বিশ্ববাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে আস্থা, মানবিকতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব ক্রমশ ক্ষমতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম