দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল সাম্বা ও ফুটবলের দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও এর আড়ালে রয়েছে এক অন্ধকার বাস্তবতাও। দেশটিতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মানসিক হতাশা ও বিষণ্নতা। আর এই মানসিক ক্ষত থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে লাখ লাখ তরুণ ঝুঁকছেন মাদক, বিশেষ করে গাঁজা সেবনের দিকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে।
Advertisement
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের হার সবচেয়ে বেশি। এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ (anxiety) আক্রান্ত জনসংখ্যার দেশও এটি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ‘ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশটিতে গত কয়েক বছরে বিষণ্নতা বিরোধী ওষুধের (Antidepressants) ব্যবহার বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
আরও পড়ুন ব্রাজিল যখন ফিলিস্তিনের পক্ষে, আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলের পাশে?তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা এবং সরকারি মানসিক চিকিৎসায় বৈষম্যের কারণে রোগীদের একটি বিশাল অংশ সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। এই চিকিৎসা-বঞ্চিত তরুণ শ্রেণিই পরে নিজেদের মানসিক কষ্ট, একাকিত্ব ও হতাশা ভুলতে রাস্তার সস্তা গাঁজা (cannabis) বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
গাঁজা সেবনের হার কেন বাড়ছে?ব্রাজিলের জাতীয় সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক ক্যানাবিস বিজনেস কনফারেন্স (ICBC)-এর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলে (Brazil) বিগত এক দশকে গাঁজার ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ (তিন কোটিরও বেশি মানুষ) জীবনে অন্তত একবার গাঁজা সেবন করেছেন। বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ নিয়মিত গাঁজা সেবন করছেন, যার বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ।
Advertisement
এর অন্যতম প্রধান কারণ আইনি শিথিলতা এবং সহজলভ্যতা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেন, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। এই আদেশ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ গ্রাম পর্যন্ত গাঁজা বা ছয়টি গাঁজার গাছ রাখা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফলে পুলিশের গ্রেফতারের ভয় কমে যাওয়ায় তরুণদের মধ্যে এটি বহনের প্রবণতা ও সহজলভ্যতা অনেক বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ প্যারাগুয়ে থেকে আমাজন নদীপথ ব্যবহার করে পিসিসি এবং সিভির মতো শক্তিশালী মাদক চক্রগুলো ফাভেলা বা বস্তি অঞ্চলের মোড়ে মোড়ে মাদক বাজারগুলোতে প্রকাশ্যে গাঁজা সরবরাহ করছে।
বিষণ্নতা ও গাঁজা সেবনের দ্বিমুখী সম্পর্ক২০২৫ সালের আগস্টে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স ডাইরেক্ট’-এ প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, গাঁজা সেবন এবং চরম মানসিক বিপর্যয় বা আত্মহননের প্রবণতার মধ্যে ‘বিষণ্নতা’ সবচেয়ে বড় যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে।
একইভাবে, ২০২৬ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনি এবং ‘সায়েন্স ডেইলি’তে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা নিশ্চিত করেছে, গাঁজা মানুষের উদ্বেগ বা হতাশা কমাতে মোটেও সাহায্য করে না।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপের আড়ালে নোংরা রাজনীতি! যে কালো সত্য গোপন রাখতে চায় ফিফামানুষ হতাশা থেকে মুক্তির আশায় গাঁজা ধরলেও, এর উপাদান ‘টিএইচসি’ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক আনন্দ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসরণ) স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে গাঁজা ছাড়া মস্তিষ্ক আর স্বাভাবিকভাবে খুশি হতে পারে না, যা মূলত ডিপ্রেশনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র করে তোলে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘আমোটিভেশনাল সিন্ড্রোম’ বলা হয়, যার ফলে তরুণরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে।
Advertisement
ব্রাজিলে শুধু গাঁজাই নয়, অন্য মারাত্মক মাদকের বিস্তারও তরুণদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোকেন ব্যবহারকারী দেশ। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি করেছে ‘ক্র্যাক কোকেন’ (Crack Cocaine)। এটি কোকেনের একটি সস্তা এবং অত্যন্ত আসক্তিপ্রদায়ক রূপ।
আনুমানিক প্রায় ১৭ থেকে ২৩ লাখ মানুষ নিয়মিত এই ‘ক্র্যাক কোকেন’ সেবন করেন। সাও পাওলো এবং রিও ডি জেনিরোর মতো মেগা সিটিগুলোর রাস্তায় শত শত মাদকাসক্ত দিনরাত প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা ও সেবন করে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ক্র্যাকোল্যান্ডিয়া’ বা ক্র্যাকের দেশ নামে পরিচিত। এই ক্র্যাকোল্যান্ডিয়াগুলোতে কিশোর ও তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
মাদক ও অপরাধের ভয়ংকর বিস্তারমাদকের এই লাগামহীন বিস্তার ব্রাজিলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। মাদক কেনা এবং গ্যাংগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের কারণে দেশটিতে সশস্ত্র ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনের হার আকাশচুম্বী।
আরও পড়ুন যে রুপার খোঁজে নাম হলো ‘আর্জেন্টিনা’, সেটাই মেলেনি কখনো!পিসিসি এবং সিভির মতো মাদক চক্রগুলো বস্তি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই চক্রগুলো অস্ত্র ও মাদক কেনার অর্থ জোগাতে এবং নিজেদের জাল বিস্তার করতে স্থানীয় তরুণ ও কিশোরদের মাদক পাচারকারী হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে রিও ডি জেনিরোর গ্যাং-নিয়ন্ত্রিত বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে চার পুলিশসহ ১২১ জন নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই অপরাধ চক্রগুলো কতটা শক্তিশালী ও সহিংস।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগব্রাজিলিয়ান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, তরুণরা মাদককে এক ধরনের ক্ষতিকর ‘কোপিং মেকানিজম’ বা মানিয়ে নেওয়ার ভুল উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাস্তব জীবনের চাপ তরুণদের মনে তীব্র একাকিত্ব সৃষ্টি করছে। সঠিক কাউন্সেলিং ও মানসিক সমর্থনের অভাব থাকায় তারা মাদককে একমাত্র আশ্রয় মনে করছে, যা তাদের অজান্তেই অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত? পরিত্রাণের উপায় কীবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান বা বন্দুকযুদ্ধ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সেন্টারে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে মানসিক কাউন্সেলিং এবং থেরাপির ব্যবস্থা করতে হবে। ডিপ্রেশনকে রোগ হিসেবে মেনে নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর (Rehab) সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলোর চিকিৎসার মান উন্নত করতে হবে, যেন মাদকাসক্ত তরুণরা সুস্থ জীবনে ফিরে আসার ভরসা পায়। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা একাকিত্ব ও হতাশা কাটানোর সুস্থ মাধ্যম খুঁজে পায়। মাদক চোরাচালানের রুটগুলো বন্ধ করতে কঠোর সীমান্ত পাহারা এবং অপরাধ চক্রগুলোর অর্থায়নের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।ব্রাজিলের এই তরুণ প্রজন্মের সংকট শুধু একটি দেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই এক সতর্কবার্তা। সময়মতো মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তি নিরাময়ে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে, দেশটির ভবিষ্যৎ জনশক্তি এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে।
সূত্র: এনআইএইচ, সায়েন্স ডিরেক্ট, সায়েন্স ডেইলি, জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি, পিএএইচও, আইসিবিসিকেএএ/