প্রথমে ২০১৮ সালে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে জামালপুর পৌর শহরের মাছিমপুর-বেলটিয়া বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই সড়কটি ভেঙে যায়। এরপর ২০২৪ সালে আবারও সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও বিভিন্ন স্থানে ভেঙে বেহাল সড়কে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও পুরো সড়কে ফাটল ধরেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন চলাচলকারী লোকজন।
Advertisement
দ্বিতীয়বার সংস্কারের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটি ভেঙে পড়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণেই এত দ্রুত সড়কের এই বেহাল দশা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, উঠে গেছে পিচঢালাই, কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গর্ত। ফলে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সড়কটি টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণ করা হোক।
সরেজমিনে দেখা যায়, শরিফপুর ইউনাইটেড পাওয়ার প্লান্টের মোড় থেকে সড়ক ধরে এগোতেই মাছিমপুর এলাকা। ওই মোড়ের শুরু থেকেই সড়কের পিচঢালাই উঠে গেছে ও ফাটল ধরেছে। কিছুদূর এগোতেই মাছিমপুর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের সামনেই সড়কটি ভেঙে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে পানি জমে আছে। যানবাহন সড়কের পাশ দিয়ে চলাচল করছে। একটু সামনেই মাছিমপুর জামে মসজিদের সামনের সড়কে ফাটল ও পিচ উঠে গেছে। মাছিমপুর মোজাদ্দেদীয়া কবরস্থানের সামনে পিচ ঢালাই উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই অংশের পুরো সড়কে ফাটল ধরেছে। আর একটু সামনে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে মাটি ফেলে চলাচল উপযোগী করা হয়েছে। পুরো সড়কটির কোথাও ছোট বড় গর্ত আবার কোথাও দেবে গেছে, কোথাও বিশাল জায়গা জুড়ে সড়কে ফাটল ধরেছে।
Advertisement
সড়কটি নিয়ে স্থানীয় লোকজন চরমভাবে ক্ষুব্ধ। কারণ সড়কটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে একমাসের বেশি সময় ভালো থাকেনি।
ক্ষোভপ্রকাশ করে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সড়কটি নির্মাণের তিন মাসের মাথায় পুরো সড়কটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মাত্র তিন মাসের মধ্যে সড়কটি বিভিন্ন স্থানে ভেঙে ও দেবে যায়। বহু জায়গায় দেখা দেয় ফাটল। পরে ধীরে ধীরে পুরো সড়কটিই চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় কালভার্ট ভেঙে গিয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় সড়কটি আর মেরামত বা সংস্কার করা হয়নি। এরপর আবারও ২০২৩ সালের শেষের দিকে সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংস্কার কাজ শেষ করতে সময় নিয়েছিল ২০২৫ সাল পর্যন্ত। কিন্তু সংস্কারে বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছিল। তখন স্থানীয় লোকজন বাধা দিয়েছিল এবং কাজও বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। নিম্নমানের কাজই হয়েছিল। ফলে সংস্কারের অল্প কিছু সময় পর আবারও সড়ক বেহাল হয়ে পড়ে। সড়কটি এখন এলাকাবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত শত পরিবারকে যানবাহনের অভাবে পায়ে হেঁটে চলাচল করতে হচ্ছে। কারণ এ সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে চায় না।
জামালপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে প্রথম সোয়া ৪ কিলোমিটার মাছিমপুর-বেলটিয়া বাইপাস সড়কটি ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় নির্মাণ করা হয়। আবার ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে সংস্কার করা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। মেসার্স মো. খাইরুল কবির রানা নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে।
সংস্কার কাজটি মেসার্স মো. খাইরুল কবির রানা নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেলেও কয়েকজন সাবঠিকাদার মিলে কাজটি করেন। তার মধ্যে একজন মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। মুঠোফোনে তিনি জাগো নিউজকে বলেন,‘কাজটি আমরা কয়েকজন মিলে করেছিলাম। কাজের কোথাও অনিয়ম হয়নি। ওই সড়কের মূল সমস্যা, সড়কটি দিয়ে ৮ থেকে ১০ টন ওজনের ভারী যানবাহন চলাচলের কথা ছিল। কিন্তু ৩০ থেকে ৩৫ টন ওজনের বালুর ট্রাক চলাচল করে। ফলে সড়কটির কিছু অংশে ফেটে যায়। সেগুলো আবারও মেরামত করে দেওয়া হয়েছে।’
Advertisement
মাছিমপুর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন বাসিন্দা সাজল মিয়া বলেন,‘এই রাস্তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। এই রাস্তাটি সব সময় বেহালই থাকে। কারণ যখনই সংস্কার হয়েছে, সেটাতে অনিয়ম হয়েছে। সংস্কারের অল্প সময়ের মধ্যে সড়কটি আবারও আগের বেহাল অবস্থায় চলে যায়। সংস্কারের সময় রাস্তা নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তাই এই রাস্তার এমন অবস্থা আমরা মেনেই নিয়েছি।’
মাছিমপুর মোজাদ্দেদীয়া কবরস্থান সংলগ্ন বাসিন্দা আয়েশা বেগম (৫০) বলেন,‘প্রতিবারই এ রাস্তা নির্মাণে অনিয়ম হয়েছে। এবার আমি ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ করেছিলাম। একইসঙ্গে এলজিইডি অফিসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলাম অনিয়মের বিষয়ে, তারা তখন আমাকে বলেছেন- আমিই কেন এসব অভিযোগ করি। এই রাস্তাটি একমাসের বেশি কখনোই ঠিক থাকে নাই। এই রাস্তা নিয়ে সঠিক তদন্ত করে দোষীদের ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার। যাতে এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে আর কেউ কখনো জড়িত হতে না পারে।’
জামালপুরের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ জাগো নিউজকে বলেন, যানজট নিরসনে ২০১৮ সালে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার সংস্কারের দরপত্রটিও আমার সময়ের না। কাজ শেষের দিকে আমি এ জেলায় যোগদান করেছি। প্রথম দিকে কিছু অনিয়মের কথা আমিও শুনেছিলাম। সেটা আবার ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। তবে সড়কটি দিয়ে ৮ থেকে ১০ টন ওজনের ভারি যানবাহন চলাচলের কথা ছিল। কিন্তু ওই সড়কটি দিয়ে শুরুতেই ৩০ থেকে ৩৫ টন ওজনের যানবাহন চলাচল করেছে। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি ভেঙে যায়। সড়কটির যেখানে ভেঙে গেছে, সেখানে মেরামতের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
হৃদয় আহম্মেদ/এমএস