সাহিত্য

আব্বার স্মৃতি, আমার ভেতরের আলো

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

Advertisement

১৯৯৯ সালের ১৬ রমজানের রাত। আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নিঃশব্দ রাতগুলোর একটি। আব্বা তখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর মাথাটা ছিল আমার কোলে। পাশে বসে মোজাম্মেল হুজুর বারবার সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করছিলেন। ঘরজুড়ে ছিল এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা—যেন সবাই জানে, বিদায়ের সময় এসে গেছে; শুধু কেউ মুখে উচ্চারণ করতে পারছে না।

সেই রাতেই আব্বা চলে গেলেন। একজন পিতার সঙ্গে সন্তানের স্মৃতির শেষ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য আশ্চর্যভাবে রয়ে যায় একেবারে স্পষ্ট। মাঝেমধ্যে আমি সেসব লিখে রাখি। নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা ভার কিছুটা নামানোর জন্য। আবার এ-ও চাই, আমার সন্তানরা যেন তাদের দাদা ভাইকে চিনতে পারে-শুধু একটি নাম হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে।

আব্বা ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসকেরা তখন প্রায় আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। মেজ ভাই কাঁদতেন অঝোরে। কিন্তু আমার মনে হতো, আব্বা ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবেন। আজও বুঝতে পারি না কেন এমন মনে হতো। হয়তো ভালোবাসা যুক্তির চেয়ে বড়। হয়তো আমরা যাদের খুব বেশি ভালোবাসি, তাদের হারানোর কথা মন কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না।

Advertisement

আশ্চর্যের বিষয়, আব্বার মৃত্যুর পর আমি যেন কাঁদতেই ভুলে গিয়েছিলাম। অনেকে বলতেন, ‘তুমি এত শক্ত কেন?’ কেউ কেউ মজা করে বলতেন, ‘তুমি তো পাষাণ!’ কিন্তু মানুষ কি সব কান্না চোখ দিয়ে কাঁদে? কিছু কিছু কান্না বুকের ভেতর শুকিয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে সেখানে নীরবে জমে থাকে।

আরও পড়ুন নারী সাহিত্য নাকি সাহিত্যে নারী: অন্তর্গত বিতর্ক

আব্বা ছিলেন অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ। জীবনের বহু ঝড়ঝাপটা তাঁর ওপর দিয়ে গেছে, কিন্তু মুখ দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। সংসারের টানাপোড়েন, দায়িত্ব, অনিশ্চয়তা—সবকিছুই তিনি এক ধরনের নীরব ধৈর্যের সঙ্গে বয়ে বেড়িয়েছেন।

আমার পড়াশোনার জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছেন। বরিশালে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়ে দুর্ঘটনায় তাঁর হাত ভেঙেছিল। আবার ছারছিনা মাদ্রাসায়ও ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আমার পড়াশোনা দীর্ঘদিন না চললেও সেই পরিবেশ থেকে ঈমান ও আমলের যে বীজ হৃদয়ে রোপিত হয়েছিল, তা আজও বেঁচে আছে।

শৈশবের একটি সকাল প্রায়ই মনে পড়ে। জানালার পাশে বসে আছি। আব্বা আমাকে পড়াচ্ছেন। মা এসে মুড়ি আর চা দিয়ে গেলেন। কোনো কিছু না বুঝলে আব্বা বিরক্ত হতেন না। ধৈর্য ধরে আবার বুঝিয়ে দিতেন। আজ এত বছর পর বুঝি, তিনি শুধু বইয়ের পাঠ শেখাননি; শিখিয়েছেন মনোযোগ, ধৈর্য আর মানুষের মতো মানুষ হওয়ার শিক্ষা। তিনিই ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষক।

Advertisement

সংসার চালানো তাঁর জন্য সহজ ছিল না। অল্প বেতন, অনিয়মিত আয়, সীমিত সামর্থ্য। ছোট্ট বোতলে আধা কেজি তেল কিনে আনতেন। বড় মাছ কেনার সামর্থ্য অনেক সময় ছিল না। মাসের শেষে কখনো কখনো বন্ধুর কাছ থেকে ধারও নিতে হতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের ছোট্ট ঘরের দরজা কখনো অতিথিদের জন্য বন্ধ ছিল না। আজ যখন বাজারের ব্যাগ ভরে ঘরে ফিরি, তখন হঠাৎ মনে হয়—এত অল্প আয়ে মানুষটি কীভাবে এত বড় হৃদয় নিয়ে বেঁচে ছিলেন?

আরও পড়ুন পলাশীর আম্রকানন থেকে আজকের বাংলাদেশ

মসজিদ, ঈদগাহ আর সমাজের নানা কল্যাণমূলক কাজে তিনি ছিলেন নিবেদিত। জুমার আগে বয়ান করতেন, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে মানুষের সহযোগিতা সংগ্রহ করতেন। ছোটবেলায় এসব দেখে বিরক্ত হতাম। মনে হতো, এত সময় কেন অন্যদের জন্য? আজ বুঝি, মানুষের জন্য কাজ করাও এক ধরনের ইবাদত।

আব্বা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করতেন। আমার কোনো চিঠি তিনি কখনো খুলে পড়েননি। লেখালেখির জন্য কখনো নিরুৎসাহ দেননি। বরং উৎসাহ দিয়েছেন। তবে একটা আক্ষেপ আজও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। আমার জীবনের অনেক অর্জন তিনি দেখে যেতে পারেননি।

আজ যদি তিনি থাকতেন, একটি লেখা ছাপা হলে তাঁকে দেখাতাম। একটি বই বের হলে তাঁর হাতে তুলে দিতাম। হয়তো কিছু বলতেন না, শুধু মৃদু হেসে বলতেন, ‘ভালো হয়েছে।’ সেই হাসিটা আর কোনো দিন দেখা হবে না।

সন্ধ্যাবেলা তিনি কখনো কখনো রুমালে বেঁধে কয়েকটা আম নিয়ে ফিরতেন। মা সেগুলো কেটে ভাগ করে দিতেন। পরিবারের সবাই মিলে সেই আম খাওয়ার আনন্দ আজও পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি স্বাদের স্মৃতিগুলোর একটি। এখন বাজারে অসংখ্য আম দেখি। কিন্তু সেই রুমালের গিঁট খুলে বের হওয়া আমগুলোর স্বাদ আর কোথাও খুঁজে পাই না।

আরও পড়ুন আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রাশোমন’ ও হেরোডোটাসের উপাখ্যান

জীবনের শেষ জুমার বয়ানে তিনি বলেছিলেন, ‘সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ কথাটা তখন শুনেছিলাম, আজ বুঝি। তিনি নিয়মিত ইবাদত করতেন, রমজানে ইতিকাফে বসতেন, পড়াশোনা করতেন, লিখতেন। সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। অনেক মূল্যবান সম্পত্তিও সহজে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি আসলে শান্তি খুঁজতেন, সরলতা খুঁজতেন।

অনেকে বলেন, আমরা বাবার মতো হতে পারিনি। হয়তো ঠিকই বলেন। কেউ কারো মতো হয় না। আমরা প্রত্যেকে আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেঁচে থাকি। তবে একটা চেষ্টা সব সময় করি—তিনি যেভাবে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করতেন, আমরাও যেন আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু ভালো কাজ রেখে যেতে পারি।

আজকাল আব্বার কথা খুব বেশি মনে পড়ে। কখনো কখনো মনে হয়, আল্লাহ যদি মাত্র এক ঘণ্টার জন্য তাঁকে ফিরিয়ে দিতেন! আমি তাঁর পাশে বসতাম। অনেক কথা বলতাম। হয়তো কিছুই বলতাম না। শুধু তাঁর হাতটা ধরে বসে থাকতাম। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য হলো—ফিরে আসা হয় না। তাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় স্মৃতির ভেতর।

আমার আব্বাও বেঁচে আছেন সেখানেই—জানালার পাশে বসে পড়ানো এক শিক্ষক হয়ে, রুমালে বাঁধা কয়েকটি আম হয়ে, জুমার বয়ানের একটি বাক্য হয়ে, আর আমার ভেতরের এক টুকরো আলো হয়ে।

এসইউ