মতামত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: জ্ঞান, মনন ও প্রতিশ্রুতির এক অনন্য উচ্চতা

শ্রদ্ধাস্পদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমার সরাসরি শিক্ষক নন, কিন্তু তাতে কী; তিনি আমার প্রাতঃস্মরণীয়দের অন্যতমজন। শ্রদ্ধাস্পদ এই জ্ঞানতাপসকে প্রায় ৩২ বছর ধরে কাছ থেকে দেখছি, তাঁর সান্নিধ্যে আছি এবং নানাভাবে তাঁকে জড়িয়ে কাজ করছি পেশাগত জীবনের প্রায় শুরু থেকেই। শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র প্রবন্ধের জন্য খ্যাত, কিন্তু তাই বলে তিনি শুধু এক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নন। অনুবাদসাহিত্য এবং গল্পের ভুবনেও তাঁর উপস্থিতি খুব করেই জানান দেয়।

Advertisement

অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার, প্রবন্ধসাহিত্যের শক্তিমান কারিগর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর শতাধিক গ্রন্থের মধ্য দিয়ে এই সত্যটি বিশাল ক্ষেত্রজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, রাজনৈতিক প্রবন্ধসাহিত্যের মুখ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠকের মাঝে শ্রেণিশাসিত সমাজ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি করা, সজাগ করে দেওয়া। রাজনীতির গুরুতর জটিল বিষয়টি কেবল তত্ত্ব দিয়ে নির্মাণ করেই একজন দায়বদ্ধ লেখকের দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না; একে শিল্পগুণে অন্বিত করাও গুরুদায়িত্ব। আরও একটি বিষয় অবশ্যই লেখককে স্মরণে রেখে এগোতে হয়, আর তা হলো গদ্যের জটিলতার বৃত্ত ভেঙে পাঠকের হৃদয়ঙ্গম করানো। উল্লেখিত সব ক্ষেত্রেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার কিংবা কারিগর হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনা আমার মতো অনেকের কাছেই লেখালেখির ক্ষেত্রে অনুসরণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিধায় তাঁর সবকিছুই আমরা, অর্থাৎ অনুসরণকারীরা, পাঠ করি ভিন্ন মাত্রায় গুরুত্বসহকারে। ওই প্রক্রিয়ায় তাঁর অনেক কিছু অনুশীলন করে পরিশীলিত হওয়ার প্রচেষ্টারত থেকে যেটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছি, তা হলো তাঁর প্রবন্ধে নানা বিষয়কে বিচিত্র দিক থেকে প্রাঞ্জল অথচ ঋজু ভাষায় উন্মোচিত করে দেখানো। তথ্যে ও তত্ত্বে ভারাক্রান্ত নয় তাঁর প্রবন্ধ। অনায়াসে তিনি জটিল ও দুরূহ সব বিষয়কে পাঠযোগ্য এবং বোধগম্য করে তোলেন সাধারণের জন্য।

আরও লক্ষ্য করার বিষয় যে, পাঠককে আনন্দ দেওয়ার চাইতেও তিনি পাঠকমনে চিন্তা জাগাতে, আত্মঅনুসন্ধানী হতে একজন দায়বদ্ধ লেখক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তাঁর প্রবন্ধের প্রসঙ্গ বিবিধ। সমাজ, গণতন্ত্র, রাজনীতি, মৌলবাদ ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়—অর্থাৎ এক কথায় রাষ্ট্র থেকে কবিতা পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর প্রায় সব প্রবন্ধের গভীরে রয়েছে যে বিষয়, তা হচ্ছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা প্রভাবিত হয় সাম্যের ভয়ে। এই ভয়ের রূপও নানা রকম। সাম্য ও স্বাধীনতাকে অনেক সময় পরস্পরবিরোধী মনে হয় এবং মনে করার কারণও আছে। এ বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয়’ প্রবন্ধগ্রন্থে স্বাধীনতা এবং সাম্যের আপদ-বিপদের নানাদিক উঠে এসেছে অত্যন্ত সুচারুরূপে।

Advertisement

১৯৩৬ সালের ২৩ জুন বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এ হিসেবে এবার তাঁর ৮৫ম জন্মদিন। শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী, কলকাতা, ঢাকা এবং যুক্তরাজ্যের লিডস ও লেস্টারে। পেশাজীবনে অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫৭-২০০১) ইংরেজি সাহিত্যে। সেখান থেকে অবসর নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধ্যাপক হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন (২০০৪-২০০৮)। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁর গ্রন্থসংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে এবং এক কথায় বলা যায়, স্যারের সব গ্রন্থই অমূল্য সম্পদ।

তিনি সচিত্র সময় (১৯৯১) ও সাপ্তাহিক সময় (১৯৯৩-৯৫)-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি এবং ২০০২ সালে সমাজ-রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা অনার্স বিভাগের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত। তাঁর সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’ ১৯ বছর অতিক্রম করেছে এবং বোদ্ধা পাঠকমহলে ‘নতুন দিগন্ত’ অন্যরকমভাবে সমাদৃত ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর ‘জাতীয়তা, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ গ্রন্থটি কালের অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই গবেষণাসমৃদ্ধ রচনা দশ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাজের ওপর এমফিল পর্যায়ে গবেষণা হয়েছে এবং তাঁর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারীর সংখ্যাও কম নয়।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে উল্লেখযোগ্য। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন এবং দুবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগের প্যানেলে মনোনয়ন পান। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক কোষাধ্যক্ষসহ (প্রায় নয় বছর এ পদে ছিলেন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে। এত কিছুর মাঝেও কলম ধরে রেখেছেন এবং এখনো এক্ষেত্রে তিনি অবিশ্রাম। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সাহিত্য পদক, লেখক শিবির পদক, ঋষিজ পদক, প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ পুরস্কারসহ অনেক পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যকে সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে দেখেন না। তাঁর সংস্কৃতির বিবেচনায় অর্থনীতিও এসে যায়, এসে যায় রাজনীতিও। যে বিষয়েই লেখেন, তাতেই থাকে অভিনবত্ব; থাকে বিশ্লেষণ, উদ্ঘাটন এবং বিশেষ করে উপস্থাপনের শৈল্পিক ছাপচিত্র। তাঁর লেখার রীতিতে রয়েছে গল্প বলার আনুষ্ঠানিকতা এবং তা-ই পাঠককে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়, সঙ্গে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং চিন্তার জগত সমৃদ্ধ করার উপকরণের জোগান দেয়।

Advertisement

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ধারার সামনের সারির এই আলোকিতজন পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনেও বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু সবকিছুর ওপরে লেখক হিসেবেই তাঁর স্থানটি মৌলিক ও স্বতন্ত্র।

উল্লেখ্য, একেকটি যুগ এবং তাতে ভূমিকা রাখা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মনোভাব উপলব্ধির জন্য সাহিত্যিক নিদর্শনগুলোর এত গভীর ও বিপুল ব্যবহার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আগে খুব কমই হয়েছে। এর সাক্ষ্য বহন করছে সময়। সংস্কৃতির প্রাণ তো আধিপত্য মেনে নেওয়ায় থাকে না, থাকে আধিপত্য ছিন্ন করায়। এই ছিন্ন করার চেষ্টার কথা আছে তাঁর ‘উপনিবেশের সংস্কৃতি’ বইতে। এর চেয়েও বেশি করে আছে অবশ্যই ছিন্ন করার যে আবশ্যকতা, তার স্বীকৃতি। পেশায় ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অঙ্গীকারে লেখক। এই দুই সত্তার ভেতর হয়তো একটি দ্বন্দ্বও রয়েছে, তবে সেটা অবৈরি; মোটেই বৈরি স্বভাবের নয়। তাঁর ‘বৃত্তের ভাঙাগড়া’ গ্রন্থটি সময়ের আরও একটি অনবদ্য দলিল।

কেন অনবদ্য দলিল? এ সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, আসলে বৃত্ত অসংখ্য। কিন্তু এর মধ্যে বড় বৃত্তও রয়েছে। যেমন সাম্রাজ্যবাদের বৃত্ত। এই বৃত্ত সবকিছুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে তার দাপট ছিল।

তাঁর প্রভাব ছিল শিল্প ও সংস্কৃতিতে। আরও উল্লেখ্য, মানুষের অন্তর্গত চিন্তা ও চেতনাকেও সে তার কর্তৃত্বের বাইরে রাখেনি। পরে সেই বৃত্ত ভেঙে আরেকটি বৃত্ত গড়ে উঠেছে পুঁজিবাদের। মানুষ চেয়েছে এদের ভাঙতে মুক্তির প্রয়োজনে। ‘বৃত্তের ভাঙা-গড়া’ গ্রন্থটি বন্ধন ও মুক্তির দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা। ওখানে অনিবার্যভাবেই তত্ত্ব এসেছে, কিন্তু তা ওপরের নয়, ভেতরের। ভেতর থেকে তা বিষয়গুলোকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলেছে। আবার তাঁর ‘সেই অখণ্ড বৃত্ত’ গ্রন্থে বৈশ্বিক বিদ্যমান ব্যবস্থাসহ অনতিক্রান্ত বৃত্ত, যা অতিক্রম করে যাওয়া অসম্ভব নয়, এ বিষয়টিই হয়ে উঠেছে মুখ্য। ‘উপর কাঠামোর ভেতরেই’ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, নতুন বৃত্ত নয়; প্রয়োজন উন্মুক্ত প্রান্তরের। কারণ উন্মুক্ত প্রান্তর ছাড়া বিকাশের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয় না। ‘ভলতেয়ার ও নজরুল’ এবং ‘অপপ্রচার, রচনা ও গুজব’—এই গ্রন্থগুলোতেও বৃত্ত ভাঙার তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টার দিকটাই নির্দেশিত হয়েছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যকে সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে দেখেন না। তাঁর সংস্কৃতির বিবেচনায় অর্থনীতিও এসে যায়, এসে যায় রাজনীতিও। যে বিষয়েই লেখেন, তাতেই থাকে অভিনবত্ব; থাকে বিশ্লেষণ, উদ্ঘাটন এবং বিশেষ করে উপস্থাপনের শৈল্পিক ছাপচিত্র। তাঁর লেখার রীতিতে রয়েছে গল্প বলার আনুষ্ঠানিকতা এবং তা-ই পাঠককে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়, সঙ্গে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং চিন্তার জগত সমৃদ্ধ করার উপকরণের জোগান দেয়।

‘অপরিচিত নায়ক পরিচিত দুর্বৃত্ত’ গ্রন্থে তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, দুর্বৃত্তকে চেনা সহজ, নায়ককে নয়। তবুও নায়কেরাই জরুরি। কারণ তারাই এগিয়ে নিয়ে যান সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে। এ নায়ক ব্যক্তিগত নন, যদিও অনেক সময় ব্যক্তিগত হিসেবেই তার পরিচয়। বিপক্ষে দুর্বৃত্তও ব্যক্তিনিরপেক্ষ। সেও একটি শক্তি, যদিও অনেক সময় তার তৎপরতা ব্যক্তির রূপ ধরে প্রকাশ পায়। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু এই ভূমিকা ইতিহাসের বাইরে নয়, বরং ইতিহাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নায়কে-দুর্বৃত্তে অবিরাম সংগ্রাম চলে। এই ঘটনা আজকের নয়; অনেক কালের। আর এ শুধু আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঘটছে না, সারা বিশ্বেই বিদ্যমান।

‘অপরিচিত নায়ক পরিচিত দুর্বৃত্ত’ বইটিতে ওই দ্বন্দ্বের বিশেষ কয়েকটি এলাকা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চিহ্নিত করেছেন। তাঁর লেখায় তত্ত্ব আছে, কিন্তু তত্ত্বের ভারবাহিকতা নেই। তাঁর দেখা যেমন বুদ্ধির, তেমনি হৃদয়ের; এবং বক্তব্য যেমন যৌক্তিক, তেমনি হৃদয়গ্রাহীও। রাজনৈতিক প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নিছক জ্ঞানের চাষাবাদ নয়। শ্রেণিবিভাজিত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করে রাজনীতির সঠিক পথটিকে নির্দেশ করা—এক্ষেত্রে রচয়িতার গদ্যরীতি ও প্রাঞ্জলতা অপরিহার্য। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ দুই-ই সার্থকভাবে পূরণ করেছেন।

তিনি যখন কলম ধরেন, তখন তাঁর গদ্যরূপটি হয়ে ওঠে একের ভেতরে বহুর রূপ। কখনো গল্পের প্রতীকী ব্যঞ্জনায়, কখনো কবিতার ছন্দ ও শব্দের অনিবার্য বিন্যাসে সমাজের স্বপ্ন ও আগামীর কল্পনার রূপকে নিজের করে নিয়ে তিনি তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। তাঁর ‘কুমুর বন্ধন’, ‘নিরাশ্রয়ী গৃহী’, ‘বেকনের মৌমাছিরা’, ‘বাঙালিকে কে বাঁচাবে’, ‘বাঙালি কাকে বলি’, ‘উদ্যানে এবং উদ্যানের বাইরে’, ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের সত্য-মিথ্যা’, ‘রাষ্ট্রের মালিকানা’, ‘আত্মপ্রতিকৃতি নয়’, ‘ভূতের নয়, ভবিষ্যতের’, ‘বন্ধ করো না পাখা’, ‘দীক্ষার খবরাখবর’, ‘রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের মতোই’, ‘নজরুলকে কোন পরিচয়ে চিনব’, ‘রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝখানে’—এমন বহু গ্রন্থে রাজনীতির শুকনো কথাগুলোকে তিনি কী করে যেন খাঁটি শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর সব বোঝাপড়া এই শিল্পের সঙ্গেই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শনে যারা অনাগ্রহী, তারাও তাঁর গদ্যের মুগ্ধ পাঠক। ‘লেনিন কেন জরুরি’ প্রবন্ধে পাওয়া যায় অসীম বিশ্বাসে দৃঢ় অন্য এক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে। ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন, সাম্যের ভয়’, ‘নোরা, তুমি যাবে কোথায়’—এ ধরনের কাব্যিক নামকরণ বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২৩ জুন শ্রদ্ধাস্পদ প্রিয় ব্যক্তিত্ব, লেখক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে (যাঁর অপরিসীম স্নেহে আমি নিত্য স্নাত) প্রণতি জানাই। তিনি আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হতে থাকুন। আমরা আরও চাই তাঁর দীর্ঘায়ু। ভালো থাকুন, স্যার। সময় আপনাকে সজীব-সচল রাখুক আমাদের সবার প্রয়োজনে। আমরা আপনার কাছে চাইবই, আপনার কাছ থেকে নেবই। হয়তো এমন বক্তব্যে কিছুটা স্বার্থপরতা প্রকাশ পায়। তবুও আপনার সৃষ্টির জন্য আমরা স্বার্থবাদীই থাকতে চাই।

ওই যে আপনি প্রায়ই আমাকে বলেন, ‘তুমি যা ভালো মনে করো, করতে থাকো’ কিংবা ‘আমার মতামতটা তুমি আমাকে যেটুকু জানো, সেভাবে দিয়ে দাও’—এই স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য আপনার ক্ষেত্রে স্বার্থবাদী হয়ে ওঠার সাহস পেয়েছি। স্যার, এই সাহস অবশ্যই স্পর্ধার নয়, শ্রদ্ধার। বিনম্র শ্রদ্ধার।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও বিশ্লেষক। এইচআর/এমএফএ/এমএস