দেশজুড়ে

৭ শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়ম, প্রায় সোয়া কোটি টাকা ফেরত দিতে সুপারিশ

পাবনার চাটমোহর উপজেলার অষ্টমনীষা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সাত শিক্ষকের নিয়োগে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। ফলে ওই সাত শিক্ষকের বেতন-ভাতা বাবদ নেওয়া সরকারের এক কোটি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৯১৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১২ মার্চ উপজেলার অষ্টমনীষা উচ্চবিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক রাকিবুল হাসান। তদন্ত ও রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়টিতে কর্মরত ১৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৩ জনই এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে সাতজন শিক্ষকের নিয়োগই বিধিসম্মত হয়নি।

প্রতিবেদন বলছে, ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষক হিসেবে আনছার আলী বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এর আগে তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত উপজেলার রূপসী উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং ২০০০ সালে প্রথম এমপিওভুক্ত হন। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য যে ১২ বছরের কাম্য অভিজ্ঞতা থাকার কথা, নিয়োগের সময় তার তা ছিল না।

Advertisement

একইভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে আয়নুল হক ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি যোগদান করেন। আগে চিনাভাতকুর ওয়ারেছিয়া দাখিল মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) পদে কর্মরত থাকলেও নতুন বিদ্যালয়ে যোগদানের সময় তিনি আগের প্রতিষ্ঠানের কোনো ছাড়পত্র জমা দেননি। অনিয়ম রয়েছে অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগেও।

২০০১ সালের ১ জানুয়ারি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ না থাকলেও সহকারী শিক্ষক স্বপ্না রানী পালকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে প্রয়োজনীয় কৃষি ডিপ্লোমা সনদ ছাড়া রোখসানা খাতুনকে ও ২০১০ সালের নীতিমালার আলোকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া রেজাউল করিমকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

গ্রহণযোগ্য নয় এমন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে মুহাম্মদ আলীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বাইরে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মূল সনদই পরিদর্শন দলের কাছে দেখাতে পারেননি আরেক সহকারী শিক্ষক হামিদুর রহমান। এসব বিষয়ে আমলে নিয়ে পর্যালোচনা করে ওই শিক্ষকদের নিয়োগকে ‘অবৈধ’ বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক স্বপ্না রানী পাল বলেন, ‘আমার কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল, সে কাগজ জমা দিয়েছিলাম। কোনো কারণে হারিয়ে গেছে অফিসের ফাইল থেকে। পরে নতুন করে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জমা দিয়েছি। আসলে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সঠিক নয়।’

Advertisement

সহকারী প্রধান শিক্ষক আয়নুল হক বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সব শিক্ষক লিখিত জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছি। আমার ছাড়পত্র দেইনি, এটা ভুল কথা। পরে তারিখ সংশোধন করে ছাড়পত্র জমা দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই মেনে নেবো।’

সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের সাবেক প্রধান শিক্ষক যিনি ছিলেন, তিনি জেলা শিক্ষা অফিস ও ডিজি অফিসে কথা বলে নিয়োগ দিয়েছেন। সেখান থেকে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে গণিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেন। যেহেতু আপনার প্রাপ্যতা আছে, সেহেতু যে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা গণিতে অনার্স-মাস্টার্স। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তাই সমাজ বিজ্ঞান/বিএসসি হিসেবে সার্কুলার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এমপিওভুক্ত হয়েছি।’

জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক আনছার আলী বলেন, আমার নিয়োগ ও অভিজ্ঞতা সঠিক। সরকারি বিধি অনুযায়ী আমার নিয়োগ ও বেতন হয়েছে। নিরীক্ষা অধিদপ্তর যে প্রতিবেদন করেছে সেটা সঠিক নয় বলে মনে করি। তবে, তৎকালীন নিয়োগ বোর্ডে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়টির সাত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অডিট আপত্তি এসেছিল বলে জেনেছি। তবে সবশেষ সেক্ষেত্রে কী হলো বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি-না, এ বিষয়ে এখনো কোনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আলমগীর হোসাইন নাবিল/এসআর/জেআইএম