পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের দিকে তাকালে হয়তো ইউসেবিও, রুই কস্তা, ডেকো, নানি কিংবা লুইস ফিগোর মতো কিংবদন্তি তারকাদের নাম চোখে পড়ে, কিন্তু দলীয় অর্জনের খোঁজ করতে গেলে একটু বেগ পেতে হয়। দেশটির ঘরের ক্লাব এফসি পোর্তো এবং বেনফিকা একাধিকবার জিতেছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগও। কিন্তু পর্তুগাল এখনও বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুলতে পারেনি একবারও।
Advertisement
১৯৬৬ সালে প্রথমবার অংশ নেওয়া এই দেশটি প্রায় ষাট বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের ভক্ত-সমর্থকদের যেন এক আশা জাগানিয়া বার্তা দিচ্ছিল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে। কিন্তু প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার পর সমর্থকদের মনে জেগেছে নতুন প্রশ্ন। তবে কি বরাবরের মতো এবারও সোনালি ট্রফিটা অধরাই থেকে যাবে রবার্তো মার্তিনেজের শিষ্যদের?
পর্তুগাল এখন অবধি মাত্র একবার উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে, যেটা আজ থেকে ১০ বছর আগে। ওই আসরে পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্বেই শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল। এছাড়া দলটি ২০১৯ এবং ২০২৫ সালে দুইবার উয়েফা নেশন্স লিগ জয় করেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে পর্তুগালের সর্বোচ্চ অর্জন বলতে ১৯৬৬ সালে একবারই তৃতীয় স্থান। এর চেয়ে বেশিদূর তারা কোনো আসরেই এগোতে পারেনি। অভিষেক আসরে তৃতীয় স্থান অধিকার করলেও এরপর শুধু ২০০৬ সালেই তারা একবার সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার সৌভাগ্যটাও আজ অবধি হয়নি এই দলের।
Advertisement
তবে এবারের আসরে পর্তুগালকে নিয়ে কেন আলাদা উন্মাদনা? মূল কারণটা খুব সাধারণভাবেই ‘সিআরসেভেন’। মেসির সঙ্গে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার দৌড়ে সমানতালে পাল্লা দেওয়া এই পর্তুগিজ তারকার জন্য এবারের আসর তার ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ। তাছাড়া অন্যবারের পর্তুগালের চেয়ে এবারের পর্তুগালের স্কোয়াডটা একটু বেশি গোছানো এবং তারকাবহুল।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ক্যারিয়ারে অনেককিছু অর্জন করলেও স্বপ্নের বিশ্বকাপ তার কাছে আজও অধরা। ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ তারকা এখন অবধি আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৪৩), যেখানে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও তার (২২৯)। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম ১০০ গোল করার রেকর্ডটিও তারই হাতে। উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ১৪টি গোল নিয়ে তিনি সেখানেও সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসে আছেন।
ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে তিনটি আলাদা প্রধান ইউরোপিয়ান লিগ (লা লিগা, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, সিরি-আ) জেতা প্রথম খেলোয়াড়ও এই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই। এছাড়া তিনিই সর্বপ্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চারটি আলাদা ক্লাবের হয়ে ১০০টিরও অধিক গোলের রেকর্ড করেছেন। ক্লাব চারটি হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস এবং আল নাসর।
রিয়াল মাদ্রিদের মতো শ্রেষ্ঠ একটি ক্লাবের সর্বকালকের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটিও তার (৪৫০ গোল)। তাছাড়া সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেওয়ার পর মাত্র এক মৌসুমেই তিনি ৩৫টি গোল করে লিগটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে যান।
Advertisement
মেসি নাকি রোনালদো এই বিতর্ক চলমান থাকলেও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে রোনালদোকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলা যায় নির্দ্বিধায়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৮৩ ম্যাচ খেলা এই তারকার ঝুলিতে রয়েছে সর্বোচ্চ গোল (১৪০) এবং সর্বোচ্চ এসিস্টের (৪২) রেকর্ডটিও। ২০১৩-১৪ মৌসুমে এক আসরেই ১৭ গোল করে তিনি হয়ে যান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাছাড়া সর্বোচ্চ ৫ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাও জিতেছেন তিনি।
ক্যারিয়ারে ৫টি ব্যালন ডি’অর জয়ের পাশাপাশি ফিফা বেস্ট মেন্স প্লেয়ার এ্যাওয়ার্ড জিতেছেন ৩ বার। তাছাড়া ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট জিতেছেন ৪টি।প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৫টি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড থাকলেও রোনালদো এখনও বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে পারেননি। তাই ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই এবার রোনালদো মাঠে নেমেছেন।
স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগাল সাধারণত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলে থাকে। পজেশন বেইজড অর্থাৎ বল পায়ে রেখে খেলাতেই বেশি পছন্দ করেন এই কোচ। গোলবারের নিচে এফসি পোর্তোর গোলরক্ষক দিয়েগো কস্তাই দলের প্রধান গোলরক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন। বদলি হিসেবে দলে আছেন হোসে সা এবং রুই সিলভা।
প্রথম ম্যাচে ডিফেন্সে রেনাতো ভেইগা এবং টমাস আরাউহোকে শুরুর একাদশে দেখা গেলেও ধারণা করা হচ্ছে বাকি টুর্নামেন্টজুড়ে এদের কেউই শুরুর একাদশে নাও থাকতে পারেন। ইনজুরির কারণে প্রথম ম্যাচে বেঞ্চে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার রুবেন দিয়াজ দ্বিতীয় ম্যাচেই একাদশে ফিরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে সঙ্গ দিতে পারেন স্পোর্টিং লিসবনের গনসালো ইনাসিও।
লেফট ব্যাকে নিঃসন্দেহেই শুরুর একাদশে থাকতে চলেছেন পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নুনো মেন্ডেস। অন্যদিকে রাইট ব্যাকে প্রথম ম্যাচের মতো জোয়াও ক্যান্সেলোই শুরুর একাদশে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুলব্যাকের বদলি হিসেবে দলে আছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দিয়োগো দালোত এবং ফেনেরবাখের ডিফেন্ডার নেলসন সেমেদো।
ফুলব্যাক হিসেবে বদলি দুজনই রাইট ব্যাক থাকার কারণ সম্ভবত হোয়াও ক্যান্সেলোর ডিফেন্সের নমনীয়তা। কারণ তিনি রাইট ব্যাকের পাশাপাশি লেফট ব্যাকেও খেলতে পারেন।
মিডফিল্ডের দিকে তাকালে অনেক বাঘা বাঘা দলের চেয়েও এবারের পর্তুগিজ মিডফিল্ড এগিয়ে আছে। ডাবল পিভটে যে জুটিকে পর্তুগালের মাঝমাঠে দেখা যাচ্ছে এই জুটিই চলতি মৌসুমে পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী দলের মাঝমাঠের ভরসার প্রতীক ছিল। হোয়াও নেভেস এবং ভিতিনহার ক্লাবের এই বোঝাপড়া জাতীয় দলে কতটা সাফল্য আনতে সাহায্য করে এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এছাড়া এটাকিং মিডে পর্তুগালের ভরসার প্রতীক প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা এটাকিং মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজ। এই মাঝমাঠকে তর্কসাপেক্ষে এবারের হট ফেবারিট ফ্রান্সের মিডফিল্ডের থেকেও শক্তিশালী বলা চলে।
মাঝমাঠে বদলি হিসেবে রয়েছেন লা লিগার ক্লাব মায়োর্কার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সামু কস্তা, ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাথেউস নুনেস এবং সৌদি লিগে খেলা রুবেন নেভেস। অবশ্য বার্নার্দো সিলভাও মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডের খেলোয়াড়। তবে কোচ মার্তিনেজ তাকে মাঝমাঠের তুলনায় যেন আক্রমণেই বেশি চান। তাই শুরুর একাদশে তাকে রাইট উইংয়ে খেলতে দেখা গেছে।
উইংয়ে পর্তুগাল কোচ যেন একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বেই রয়েছেন যে কাকে রেখে কাকে খেলাবেন। কারণ পর্তুগালের শেষ কয়েকটি ম্যাচে একাধিক কম্বিনেশনের উইঙ্গারকে শুরুর একাদশে দেখা গেছে। কখনও রাফায়েল লিয়াও এবং ফ্রান্সেস্কো কন্সেইকাও, কখনও পেদ্রো নেতোর সাথে বার্নার্দো সিলভা, কখনও আবার ফ্রান্সেস্কো ত্রিনকাওয়ের সাথে জোয়াও ফেলিক্স; সমীকরণটা বেশ জটিল।
চলতি গোলের সমীকরণের দিকে তাকালে অবশ্য হোয়াও ফেলিক্স তার অন্য সতীর্থদের থেকে এগিয়ে থাকবেন। তবে সৌদি প্রো লিগে একক আধিপত্য দেখানো পারফরম্যান্স বিশ্বকাপের মঞ্চে কতটা সহায়ক হবে সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।
চলতি মৌসুমে রাফায়েল লিয়াও এসি মিলানের জার্সিতে ২৯ ম্যাচে গোল করেছেন ৯টি এবং অ্যাসিস্ট করেছেন ৩টি। চেলসির ফরোয়ার্ড পেদ্রো নেতো ৩৪ ম্যাচে করেছেন ৫টি গোল এবং ৬টি অ্যাসিস্ট। জুভেন্টাসের ফ্রান্সেস্কো কন্সেইকাসাও ৩১ ম্যাচে গোল করেছেন ৩টি এবং এসিস্ট করেছেন ৫টি। চলতি মৌসুমে স্পোর্টিং লিসবনের জার্সিতে ফ্রান্সেস্কো ত্রিনকাওয়ের ৩৪ ম্যাচে রয়েছে ৭টি গোল এবং ১১টি এসিস্ট।
বার্নার্দো সিলভা ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চলতি মৌসুমে ৩৮ ম্যাচে ২টি গোল এবং ৪টি এসিস্ট করেছেন। তবে ক্লাবে সাধারণত তিনি এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই খেলে থাকেন। গনসালো গুয়েদেস রিয়াল সোসিয়াদাদের হয়ে চলতি মৌসুমে ৩২ গোল করেছেন ৮টি এবং এসিস্ট করেছেন ৪টি।
তবে হোয়াও ফেলিক্স সৌদি প্রো লিগে আল নাসরের জার্সিতে ৩৩ ম্যাচে গোল করেছেন ২০টি এবং এসিস্ট করেছেন ১৩টি, যা উইঙ্গারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।পর্তুগালের এই এটাকিং লাইন আপে একাধিক খেলোয়াড় এমন রয়েছেন যারা দুই উইংয়েই সমানতালে খেলতে পারেন, ফলে কোচও তাদের নিয়ে অনেকটাই সন্দিহান।
নম্বর নাইন বা সেন্টার ফরোয়ার্ড রোলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেই শুরুর একাদশে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে তেমন ভালো না খেললেও ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলনে মার্তিনেজ সাফ জানিয়ে দেন যে রোনালদোই শুরুর একাদশে থাকবে এবং এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
রোনালদোর বদলি হিসেবে দলে থাকা পিএসজির সেন্টার ফরোয়ার্ড গনসালো রামোসের চলতি মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ৩০ ম্যাচে গোল রয়েছে ৬টি এবং এসিস্ট রয়েছে মাত্র ১টি।
গত বিশ্বকাপকেই রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ধরা হচ্ছিল। কিন্তু সব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের সোনালী শিরোপা উঁচিয়ে ধরার প্রত্যাশায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আবারও মাঠে নামছেন এই ৪১ বছর বয়সে। তিনি তার ক্যারিয়ারের একদম সীমানায় এসে শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে পারবেন কিনা তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার কোটি কোটি সমর্থক।
আরএএইচইউএল/আইএইচএস/