এককালে তপ্ত দুপুরে ঘরের দাওয়ায় কিংবা উঠোনে পাতা এক ফালি মাদুর যেন এক টুকরো শীতল স্বর্গ। স্মৃতির পটে হামাগুড়ি দিলে আজও বাঙালির মনে ভেসে ওঠে মেঠো সংস্কৃতির চিরচেনা আসনটি। কেবল বসার বা শোয়ার অনুষঙ্গই নয়, হাতে বোনা মাদুর মূলত আমাদের লোকশিল্প ও আভিজাত্যের নীরব সাক্ষী। অতীতে অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রাত্যহিক নানা প্রয়োজনে মাদুর ছিল অপরিহার্য। তবে সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে রঙিন শিল্পটি অস্তিত্ব সংকটে। কারিগরদের অনেকেই ছেড়েছেন বাপ-দাদার পেশা। ফলে বিলুপ্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে বাঙালির আবেগমাখা ঐতিহ্য।
Advertisement
মাদুর বুননের রসায়নে লুকিয়ে আছে চমৎকার পারিবারিক মেলবন্ধন। সাধারণত পুরুষেরা মাঠ থেকে মাদুর তৈরির প্রধান উপকরণ ‘মেলে ঘাস’ কেটে এনে জোগান দেন। ঘরের নারীরা নিপুণ হাতে তা বুনে তোলেন। এই শৈল্পিক বুনন মূলত দুই পদ্ধতিতে হয়—‘একহারা’ ও ‘দোহারা’। একহারা পদ্ধতিতে সুতোর ওপর-নিচে পর্যায়ক্রমে দুটি কাঠি পরানো হয়; আর দোহারা পদ্ধতিতে দুটি দড়ির ওপর-নিচে চলে কাঠির খেলা। অনেক সময় ছোট ছোট কয়েক টুকরো মাদুর কাপড় দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয় বিশাল আকৃতির মাদুর।
মাদুরের জমিনে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায় কারুকার্যের বাহার দেখে। এর নকশায় কেবল জ্যামিতিক রেখাই থাকে না, থাকে বাংলার প্রাচীন কাব্য ও রূপকথার ছোঁয়া। কোথাও মূর্ত হয়ে ওঠে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, কোথাওবা রাম-রাবণের মহাকাব্যিক যুদ্ধ। এ বুননশৈলীতে যেমন তাঁত শিল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায়; তেমনই এর সূক্ষ্ম কারুকাজ মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথার কথা।
আরও পড়ুন হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে স্বাবলম্বী পুরো গ্রাম দুই বাংলার মানচিত্রইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এ মাদুর শিল্পের আদি উৎস ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে মেদিনীপুর জেলাকে এ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র বলা যায়। সবং থানার তালদা, সারতা, পাঁশকুড়ার রঘুনাথবাড়ি, ময়না, রামনগর, হলদিয়াসহ ঘরে ঘরে সেখানে মাদুর তৈরির ধুম পড়ে। এ ছাড়া কোচবিহার, বীরভূমের শ্রীনিকেতন এবং চব্বিশ পরগণার বিভিন্ন অঞ্চলে এটি বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হয়।
Advertisement
ওপার বাংলার মতো বাংলাদেশেও আছে মাদুরের এক সমৃদ্ধ অতীত। মৌলভীবাজারের রাজনগর ও বড়লেখা, সিলেটের বালাগঞ্জ, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি এবং ফরিদপুরে এর প্রচলন আছে। তবে এ দেশে মাদুর শিল্পের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। এখানকার কাঁদাকাটি, বড়দল, খাজরা ও প্রতাপনগর এলাকা একসময় মাদুরের গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ আজ সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র এ স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন।
থমকে যাওয়া চাকাদুই দশক আগেও আশাশুনির তেঁতুলিয়া গ্রামের ৯০ শতাংশ পরিবারের দিন চলতো মাদুর বুনে ও বিক্রি করে। আজ সেই গ্রাম নিস্তব্ধ। সারা বাংলাদেশেই এ কুটির শিল্পে আশঙ্কাজনক ধস নেমেছে। এর পেছনে রয়েছে কিছু অমোঘ বাস্তব কারণ—
আরও পড়ুন খাগড়াছড়িতে লিচুর সমারোহ, কম দামে মিলছে রসালো ফল স্বল্প মুনাফাএকজন কারিগরের দিনভর খাটুনির পর লাভ থাকে নামমাত্র। আশাশুনির মাদুর বিক্রেতা আফজাল মিয়া জানান, একটি ছোট মাদুর তৈরিতে খরচ ২৫০-৩০০ টাকা, বিক্রি হয় ৩৫০ টাকায়। বড় মাদুরে ৫০০ টাকা খরচ করে মেলে মাত্র ১০০ টাকা লাভ। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব।
কাঁচামালের অভাবমাদুরের মূল প্রাণ ‘মেলে ঘাস’ এখন দুষ্প্রাপ্য। বাজারে চাহিদা কম থাকায় চাষিরা এ ঘাস চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে তীব্র কাঁচামাল সংকটে ভুগছেন কারিগররা।
Advertisement
সস্তা এবং টেকসই বিকল্প মাদুর এখন বাজার দখল করে নিয়েছে। কৃত্রিম এ পণ্যের ভিড়ে হেরে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব মেলে ঘাসের তৈরি সুদৃশ্য মাদুর।
আরও পড়ুন চাঁদপুরে ৭৫ জাতের বিদেশি আম চাষে সফল হেলাল উদ্দিন প্রজন্মের অনীহানতুন প্রজন্ম আর এই ক্ষয়িষ্ণু পেশায় জড়াতে চাইছেন না। চাহিদার অভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কারিগর মা-বাবারাই তাদের সন্তানদের এই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন।
সময়ের দাবিশত প্রতিকূলতার মাঝেও এ লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চান সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। কারিগরদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সহজ শর্তে ঋণ, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্রেতাদের সচেতনতাই পারে এ শিল্পকে নতুন জীবন দিতে।
আরও পড়ুন ফরিদপুরে আলুবোখারা চাষ / রাগ করে কেটে ফেলেন ১৮টি গাছ, ৭টিতেই হাবিবুরের বাজিমাতপশ্চিমবঙ্গ সরকার মাদুরকে ভৌগোলিক স্বীকৃতি বা জিআই ট্যাগ দিয়ে একে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেছে। বাংলাদেশও যদি এ শিল্প রক্ষায় এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে হয়তো আবারও বাঙালির বৈঠকখানায় ফিরবে মাটির গন্ধ আর মেলে ঘাসের চিরন্তন শীতলতা।
এসইউ