ফুটবল মাঠে গোল, ট্রফি আর রেকর্ডের লড়াই নিয়ে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও নেইমারকে ঘিরে আলোচনা কখনোই থামে না। কোটি কোটি ভক্তের কাছে তারা ফুটবলের সুপারস্টার। কিন্তু মাঠের বাইরেও তাদের আরেকটি পরিচয় রয়েছে-মানবিক মানুষ হিসেবে। এই এক জায়গায় সব ভক্ত এক সুরে সুর মেলান।
Advertisement
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিশুর কাছে এই তিন তারকা শুধু খেলোয়াড় নন, বরং আশা, স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। কখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের জন্য স্কুল গড়ে তুলে, কখনো অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার খরচ বহন করে, আবার কখনো হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন, ফুটবলের বাইরেও মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।
যুদ্ধের অন্ধকারে মেসির আলোর বার্তাসময়টা ২০১৭ সাল, সিরিয়ার যুদ্ধ লাখো শিশুর শৈশব কেড়ে নিয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য স্কুল। অনেক শিশুর কাছে বই-খাতা আর ক্লাসরুম তখন শুধুই স্মৃতি। এমন সময় লিওনেল মেসির ফাউন্ডেশন এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে সিরিয়ায় ২০টি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে সহায়তা করে। এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিশু আবার পড়াশোনার সুযোগ পায়। যেসব শিশু প্রতিদিন গোলাগুলি আর বিস্ফোরণের শব্দ শুনে বড় হচ্ছিল, তারা আবার শিক্ষকের ডাক শুনতে শুরু করে। স্কুল তাদের জীবনে ফিরিয়ে আনে স্বাভাবিকতার অনুভূতি।
আরও পড়ুন আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন?মেসি বহুবার বলেছেন, শিশুদের মুখে হাসি দেখতে পাওয়াই তার জীবনের অন্যতম বড় আনন্দ। সিরিয়ার সেই শিশুদের কাছে তিনি শুধু বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক নন, বরং এমন একজন মানুষ, যিনি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও মেসির ফাইন্ডেশন এ ধরনের নানান মানবিক কাজ করে থাকে।
Advertisement
২০১৪ সালে এরিক অরটিজ ক্রুজ নামের এক শিশুর পরিবার কঠিন সংকটে পড়েছিল। শিশুটি কর্টিকাল ডিসপ্লাসিয়া নামের জটিল স্নায়বিক রোগে ভুগছিল। জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। অর্থাভাবে পরিবারটি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কাছে সাহায্য চায়। তাদের আশা ছিল, রোনালদো যদি একটি স্বাক্ষর করা জার্সি বা বুট দেন, তাহলে সেটি নিলামে বিক্রি করে চিকিৎসার কিছু অর্থ জোগাড় করা যাবে।
আরও পড়ুন রোনালদোর ৭ বিশ্বরেকর্ডকিন্তু রোনালদো শুধু জার্সি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি শিশুটির অস্ত্রোপচারের পুরো ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেই খরচ প্রায় ৮৩ হাজার মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি স্বাক্ষর করা জার্সি ও বুটও পাঠান। ফলে পরিবারকে সেগুলো বিক্রি করতে হয়নি; বরং স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিল। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। কারণ একজন তারকার সামান্য সহানুভূতিও কখনও কখনও একটি পরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
নেইমারের স্বপ্ন: হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ামেসি ও রোনালদোর মতো নেইমারের মানবিক গল্প হয়তো তুলনামূলক কম আলোচিত হয়। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান এই তারকার সবচেয়ে বড় অবদান হলো হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্প গড়ে তোলা।
২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রজেক্ট ইনস্টিটিউট প্রজেক্ট নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের প্রাইয়া গ্রান্দে এলাকায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান দরিদ্র শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। নেইমার নিজেও সাধারণ পরিবেশে বড় হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩ হাজার শিশু ও কিশোরকে সরাসরি সেবা দেয় এবং তাদের পরিবারসহ ১০ হাজারের বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। তাই সফল হওয়ার পর তিনি নিজের এলাকার শিশুদের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে তারা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
Advertisement
বর্তমানে হাজার হাজার শিশু এই প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা, পুষ্টি, খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ।
একবার বার্সেলোনায় খেলার সময় তার ফাউন্ডেশনের দুই শিশুকে বিশেষ পুরস্কার হিসেবে বার্সেলোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারা প্রথমবার বিমানে চড়ে বিদেশ সফরের সুযোগ পায় এবং সরাসরি নিজেদের আদর্শ নেইমারের সঙ্গে দেখা করে। নেইমার নিজে তাদের উৎসাহ দেন এবং স্বপ্ন দেখতে শেখান।
করোনা মহামারির সময়ও তার মানবিক দিক আলোচনায় আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তিনি কর্মীদের বেতন দেওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন, যাতে তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে না পড়ে।
ছোট ছোট মুহূর্ত, বড় প্রভাবএই তিন তারকার মানবিকতার গল্প শুধু বড় প্রকল্প বা অর্থ সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায়ই দেখা যায়, তাঁরা হাসপাতালে অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে দেখা করছেন, ছবি তুলছেন বা সময় কাটাচ্ছেন। কখনো কোনো শিশুভক্তকে নিজের জার্সি উপহার দিচ্ছেন, কখনো আবার মাঠে ঢুকে পড়া ছোট্ট ভক্তকে বকাঝকা না করে জড়িয়ে ধরছেন। এসব মুহূর্ত হয়তো কয়েক মিনিটের। কিন্তু সেই শিশুদের কাছে তা আজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকে।
ফুটবলের বাইরে তাদের জয়ফুটবলের ইতিহাসে গোলের সংখ্যা, ব্যালন ডি’অর কিংবা ট্রফির হিসাব একদিন বদলে যেতে পারে। নতুন তারকা আসবে, নতুন রেকর্ড গড়বে। কিন্তু কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, কোনো অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার মতো কাজগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না।
লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও নেইমার মাঠে যত বড় তারকাই হোন না কেন, তাদের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হয়তো এখানেই তারা অসংখ্য শিশুর জীবনে আশা, সাহস এবং হাসির কারণ হয়েছেন। ফুটবল তাদের বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু মানবিকতাই তাদের কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
সূত্র: ডেইলি রেকর্ড, এনবিসি নিউজ, ডেইলি সান
আরও পড়ুন নেইমারের যত বিশ্বরেকর্ড ও অনন্য কীর্তিকেএসকে